শত বছরের অমলিন কীর্তি রংপুরের তাজহাট জমিদারবাড়ি। কালের পরিক্রমায় আমাদের অনেক কীর্তি হারিয়ে গেলেও এখনো অস্তিত্ব টিকিয়ে রেখেছে তাজহাট জমিদারবাড়ি। শহর থেকে অল্প কিছুদূরেই এর অবস্থান। রিকশায় যেতে আধা ঘন্টার মতো সময় লাগে।
ঢাকা থেকে ট্রেন ও বাসে রংপুর যাওয়া যায়। রাজধানীর গাবতলীতে এসআর ট্রাভেলস, টিআর ট্রাভেলস, নাবিল, হানিফ, শ্যামলী, এসএ পরিবহনের গাড়ি পাওয়া যায়। এছাড়া রংপুর এক্সপ্রেস সরাসরি রংপুর যায়। রংপুর শহর থেকে তাজহাট রাজবাড়ি যেতে হবে রিকশায়। রিকশা ভাড়া ১৫ থেকে ২০ টাকা।
প্রধান ফটক পেরিয়ে ১০০ গজের মতো দূরত্বে রাজবাড়িটি। প্রধান রাস্তা থেকে বেরিয়ে একটি ছোট রাস্তা সামান্য বাঁক নিয়ে পৌঁছেছে। রাস্তার দুই পাশে আকাশসম উচ্চতার নারকেল গাছ। গাছের পাতার শব্দে বাতাসে ঐকতান। বেশ চিত্তাকর্ষক।
বাড়িটির সামনে ও পাশে দুটি পুকুর। পুকুরে শান বাধানো। বেশ বড়। টলটলে পানি। সব কিছু সাজানো-গোছানো। একপলকেই চোখ জুড়িয়ে যায়।
সব মিলিয়ে ৯৬ একরজুড়ে বিশাল এ রাজবাড়ি। বাড়ির সামনেই বিশাল বাগান।
রাজবাড়ি আর বাগান বাদে পুরো অংশেই রয়েছে বাগান। ফুল আর ফলের বাগান। কাঁঠাল, আম আর পেয়ারার বাগান। অবশিষ্ট অংশে ফুলের বাগান। নরম সবুজ ঘাস আবৃত করে রেখেছে ফুলের বাগান। বাড়িটিতে নিস্তব্ধতা।
বাড়ির বিশালতায় যেন শোনা যায় প্রাসাদের অতীত রমণীর নিক্বণ। কানে অনুরণন তোলে সেতারের মূর্ছনা, রাগ আর ঠুমরির সুর লহরি। রাজা যেন আয়েশ করে হুক্কায় টান দেন, আর অর্ডার করা মাত্রই উজির-নাজির আদেশ তামিলে ব্যস্ত হয়ে পড়েন।
রাজবাড়িটি পূর্বমুখী। দোতলা। প্রাসাদটির দৈর্ঘ্য ৭৬ দশমিক ২০ মিটার। এটির ভূমি নকশা ইংরেজি ইউর মতো। পশ্চিম দিক উন্মুক্ত। নিচতলায় প্রবেশপথের পশ্চাতে ১৮ দশমিক ২৯ বাই ১৩ দশমিক ৭২ মিটার মাপের হল ঘর আছে। বাড়িটির ভেতরে পুরোভাগেই আছে ৩ মিটার প্রশস্ত বারান্দা।
১৫ দশমিক ২৪ মিটার প্রশস্ত কেন্দ্রীয় সিঁড়িটি সরাসরি দোতলায় চলে গেছে। এগুলো ইতালি থেকে আনা মার্বেল পাথরে তৈরি। এ সিঁড়ির উভয় পাশে দোতলা পর্যন্ত ইতালীয় মার্বেলের ধ্রুপদী রোমান দেবদেবীর মূর্তি দ্বারা সজ্জিত ছিল। অযত্ন-অবহেলা এবং যথাযথ সংরক্ষণের অভাবে এগুলো হারিয়ে গেছে।
বাড়িটির সামনের দিকে দুই প্রান্তে সেমি আট কোনা ও মধ্যভাগে একটি ৯ দশমিক ১৪ মিটার উঁচু বারান্দা রয়েছে। ওই বারান্দার ছাদের ওপর চারটি সুসজ্জিত করিন্থীয় স্তম্ভ ও দুই পাশের একই ধরনের স্তম্ভ রয়েছে।
এর ওপর ত্রিকোণ আকৃতির চালের দুটি কক্ষ আছে। ওপর তলায় ওঠার জন্য দুটি কাঠের সিঁড়ি রয়েছে। প্রাসাদের পেছনের দিক দিয়ে উপরে ওঠার জন্য দুই প্রান্তে দুটি গোলাকৃতির লোহার সিঁড়ি রয়েছে। এ প্রাসাদে কক্ষ আছে ২২টি।
প্রাসাদ থেকে সদর ফটকে যাওয়ার পথের দুই পাশে প্রাসাদের সামনে দুটি বড় আকৃতির পুকুর আছে। পুকুর দুটির চারদিকে প্রায় দুই দশমিক পাঁচ ফুট উঁচু কারুকার্যময় দেয়াল রয়েছে। আছে সুদৃশ্য সিঁড়ি। পুকুর দুটির চারদিকে রয়েছে নারকেল গাছের সারি।
ইতিহাস থেকে জানা যায়, তাজহাট জমিদার বংশের প্রতিষ্ঠাতা মান্না লাল রায়। তিনি পাঞ্জাব থেকে এসে রংপুরের মাহীগঞ্জে বসবাস শুরু করেন। সে সময় মাহীগঞ্জ ছিল রংপুরের জেলা শহর।
গল্প প্রচলিত আছে, স্বর্ণ ব্যবসায়ী মান্না লাল রায়ের আকর্ষণীয় 'তাজ' আর 'রত্ন'খচিত মুকুটের কারণে এ এলাকার নামকরণ হয় তাজহাট। জীবদ্দশায় তিনি বিপুল পরিমাণ ভূসম্পত্তির মালিক হন। রংপুরের অনেক এলাকা তার আয়ত্তে আসে।
বংশপরম্পরায় মান্না লাল রায়ের নাতি ধনপতি লাল জমিদার হন। ধনপতি রায়ের নাতি উপেন্দ্র লাল রায় জমিদারি গ্রহণের পর অল্প বয়সে মারা যান। তখন জমিদারির দায়িত্ব তার কাকা 'মুনসেফ' গিরিধারী লাল রায়ের হাতে আসে। তিনি নিঃসন্তান হওয়ার কারণে কলকাতার গোবিন্দ লালকে দত্তক হিসেবে গ্রহণ করেন।
গোবিন্দ লাল ১৮৭৯ সালে এই জমিদারির উত্তরাধিকারী হন। পরে তিনি ১৮৮৫ সালে রাজা, ১৮৯২ সালে রাজাবাহাদুর এবং ১৮৯৬ সালে মহারাজা উপাধি লাভ করেন। ১৮৯৭ সালে ভূমিকম্পে নিজ বাড়ির ধ্বংসস্তূপের নিচে চাপা পড়ে তিনি মারা যান।
১৯০৮ সালে তার ছেলে মহারাজা কুমার গোপাল লাল রায় জমিদারির দায়িত্বভার গ্রহণ করেন। ১৯৪৭ সালে দেশভাগের পর মহারাজা কুমার গোপাল লাল রায় রাজবাড়ির মালপত্র গুছিয়ে ট্রেনে ভারতে যাওয়ার সময় কুষ্টিয়ায় হূদযন্ত্রের ক্রিয়া বন্ধ হয়ে মৃত্যুবরণ করেন। ছেলেমেয়েরা তার লাশ ও মালপত্র নিয়ে ভারতে চলে যান। এখন রাজবাড়িতে জমিদার আমলের কাঠের একটি টেবিল-চেয়ার ও ঝাড়বাতির অংশ আছে কালের সাক্ষী হয়ে।
মহারাজা কুমার গোপাল লাল রায় জমিদারির দায়িত্ব গ্রহণের পর বর্তমান ভবনটির নির্মাণ শুরু হয়। দক্ষ নকশাকার ছাড়াও সব মিলিয়ে কাজ করেন প্রায় দুই হাজার রাজমিস্ত্রী। ১৯১৭ সালে ভবনটি সম্পূর্ণ হয় এবং সে সময়ের হিসেবে এতে খরচ হয় প্রায় দেড় কোটি টাকা।
ইতালি থেকে আমদানিকৃত শ্বেতপাথর দিয়ে তৈরি করা হয়েছিল এ বাড়ির সম্মুখ সিঁড়িটি। এছাড়া ভবনের প্রধান প্রধান অংশ তৈরিতে ব্যবহার করা হয় লাল ইট, শ্বেতপাথর ও চুনাপাথর।
পুরো ভবনটিতে রয়েছে ২৮টি কক্ষ। ভবনের সামনে মার্বেল পাথরের সুদৃশ্য একটি ফোয়ারা আজো বিদ্যমান। ঢাকার আহ্ছান মঞ্জিলের মতো দেখতে এ জমিদার বাড়ির তৃতীয় ও চতুর্থ তলায় রয়েছে রাজা গোপালের ব্যবহূত নানা জিনিস।
১৯৫২ সালে জমিদারি প্রথা বিলুপ্ত হওয়ার পরে এ বাড়ি চলে যায় কৃষি বিভাগের অধীনে এবং এখানে গড়ে ওঠে কৃষি প্রশিক্ষণ ইনস্টিটিউট।
মুক্তিযুদ্ধের সময় এ বাড়ির প্রচুর মূল্যবান সম্পদ খোয়া যায়। ১৯৮৫ সালে এখানে হাইকোর্টের একটি বেঞ্চ চালু হয়। পরবর্তীতে ১৯৮৭ সালে তাজহাট জমিদার বাড়ি রূপান্তর করা হয় জাদুঘরে। আর এর নাম রংপুর জাদুঘর। এ জাদুঘরে ৩০০টি মূল্যবান নিদর্শন রয়েছে।
দোতলার সংগ্রহশালায় দুই হাজার বছরের পুরনো ছাদ, 'কচিকা পাথর'। বেগম রোকেয়ার চিঠি, তুলট কাগজে লেখা সংস্কৃত হস্তলিপি, পাঁচ কালেমার শাহাদাত উত্কীর্ণ আরবি শিলালিপি, ৬৯ হিজরির পোড়ামাটির লিপি, ১২০০ খ্রিস্টাব্দের শিলালিপি, ১৬৯১ সালের কালো পাথরের সংস্কৃতি শিলালিপি, এক দশমিক ৫ ইঞ্চি দৈর্ঘ্য, এক ইঞ্চি প্রস্থ ও আধা ইঞ্চি পুরো কোরআন শরিফ, পোড়ামাটির সীলমোহর, মাটির পাত্র, বৃহত্ হাতির দাঁত ও হাতির দাঁতের পাশা, বিভিন্ন আকার ও সময়ের অনেক বিষ্ণুমূর্তিসহ নিদর্শন।
মূল ফটকে জনপ্রতি ১০ টাকা টিকিট কেটে প্রবেশ করতে হয়। মূল জাদুঘরে ছবি তোলার অনুমতি নেই। প্রাসাদের বাইরে ছবি তোলা যাবে।
ভাওয়াইয়া গান আর ব্রিটিশবিরোধী আন্দোলনের কেন্দ্র রংপুরে তাজহাট রাজবাড়িসহ রাজা রামমোহন রায় ও বেগম রোকেয়ার বাড়ি, শাহ সুলতান গাজীর মসজিদ, জেলার দর্শনীয় স্থানগুলোর মধ্যে আছে চিকলির বিল, রংপুর বিশ্ববিদ্যালয়, কারমাইকেল কলেজ, কেরামতিয়া মসজিদ, মিঠাপুকুর মসজিদ, শতরঞ্জির পল্লী রয়েছে দেখার মতো।
ঢাকা থেকে ট্রেন ও বাসে রংপুর যাওয়া যায়। রাজধানীর গাবতলীতে এসআর ট্রাভেলস, টিআর ট্রাভেলস, নাবিল, হানিফ, শ্যামলী, এসএ পরিবহনের গাড়ি পাওয়া যায়। এছাড়া রংপুর এক্সপ্রেস সরাসরি রংপুর যায়। রংপুর শহর থেকে তাজহাট রাজবাড়ি যেতে হবে রিকশায়। রিকশা ভাড়া ১৫ থেকে ২০ টাকা।
প্রধান ফটক পেরিয়ে ১০০ গজের মতো দূরত্বে রাজবাড়িটি। প্রধান রাস্তা থেকে বেরিয়ে একটি ছোট রাস্তা সামান্য বাঁক নিয়ে পৌঁছেছে। রাস্তার দুই পাশে আকাশসম উচ্চতার নারকেল গাছ। গাছের পাতার শব্দে বাতাসে ঐকতান। বেশ চিত্তাকর্ষক।
বাড়িটির সামনে ও পাশে দুটি পুকুর। পুকুরে শান বাধানো। বেশ বড়। টলটলে পানি। সব কিছু সাজানো-গোছানো। একপলকেই চোখ জুড়িয়ে যায়।
সব মিলিয়ে ৯৬ একরজুড়ে বিশাল এ রাজবাড়ি। বাড়ির সামনেই বিশাল বাগান।
রাজবাড়ি আর বাগান বাদে পুরো অংশেই রয়েছে বাগান। ফুল আর ফলের বাগান। কাঁঠাল, আম আর পেয়ারার বাগান। অবশিষ্ট অংশে ফুলের বাগান। নরম সবুজ ঘাস আবৃত করে রেখেছে ফুলের বাগান। বাড়িটিতে নিস্তব্ধতা।
বাড়ির বিশালতায় যেন শোনা যায় প্রাসাদের অতীত রমণীর নিক্বণ। কানে অনুরণন তোলে সেতারের মূর্ছনা, রাগ আর ঠুমরির সুর লহরি। রাজা যেন আয়েশ করে হুক্কায় টান দেন, আর অর্ডার করা মাত্রই উজির-নাজির আদেশ তামিলে ব্যস্ত হয়ে পড়েন।
রাজবাড়িটি পূর্বমুখী। দোতলা। প্রাসাদটির দৈর্ঘ্য ৭৬ দশমিক ২০ মিটার। এটির ভূমি নকশা ইংরেজি ইউর মতো। পশ্চিম দিক উন্মুক্ত। নিচতলায় প্রবেশপথের পশ্চাতে ১৮ দশমিক ২৯ বাই ১৩ দশমিক ৭২ মিটার মাপের হল ঘর আছে। বাড়িটির ভেতরে পুরোভাগেই আছে ৩ মিটার প্রশস্ত বারান্দা।
১৫ দশমিক ২৪ মিটার প্রশস্ত কেন্দ্রীয় সিঁড়িটি সরাসরি দোতলায় চলে গেছে। এগুলো ইতালি থেকে আনা মার্বেল পাথরে তৈরি। এ সিঁড়ির উভয় পাশে দোতলা পর্যন্ত ইতালীয় মার্বেলের ধ্রুপদী রোমান দেবদেবীর মূর্তি দ্বারা সজ্জিত ছিল। অযত্ন-অবহেলা এবং যথাযথ সংরক্ষণের অভাবে এগুলো হারিয়ে গেছে।
বাড়িটির সামনের দিকে দুই প্রান্তে সেমি আট কোনা ও মধ্যভাগে একটি ৯ দশমিক ১৪ মিটার উঁচু বারান্দা রয়েছে। ওই বারান্দার ছাদের ওপর চারটি সুসজ্জিত করিন্থীয় স্তম্ভ ও দুই পাশের একই ধরনের স্তম্ভ রয়েছে।
এর ওপর ত্রিকোণ আকৃতির চালের দুটি কক্ষ আছে। ওপর তলায় ওঠার জন্য দুটি কাঠের সিঁড়ি রয়েছে। প্রাসাদের পেছনের দিক দিয়ে উপরে ওঠার জন্য দুই প্রান্তে দুটি গোলাকৃতির লোহার সিঁড়ি রয়েছে। এ প্রাসাদে কক্ষ আছে ২২টি।
প্রাসাদ থেকে সদর ফটকে যাওয়ার পথের দুই পাশে প্রাসাদের সামনে দুটি বড় আকৃতির পুকুর আছে। পুকুর দুটির চারদিকে প্রায় দুই দশমিক পাঁচ ফুট উঁচু কারুকার্যময় দেয়াল রয়েছে। আছে সুদৃশ্য সিঁড়ি। পুকুর দুটির চারদিকে রয়েছে নারকেল গাছের সারি।
ইতিহাস থেকে জানা যায়, তাজহাট জমিদার বংশের প্রতিষ্ঠাতা মান্না লাল রায়। তিনি পাঞ্জাব থেকে এসে রংপুরের মাহীগঞ্জে বসবাস শুরু করেন। সে সময় মাহীগঞ্জ ছিল রংপুরের জেলা শহর।
গল্প প্রচলিত আছে, স্বর্ণ ব্যবসায়ী মান্না লাল রায়ের আকর্ষণীয় 'তাজ' আর 'রত্ন'খচিত মুকুটের কারণে এ এলাকার নামকরণ হয় তাজহাট। জীবদ্দশায় তিনি বিপুল পরিমাণ ভূসম্পত্তির মালিক হন। রংপুরের অনেক এলাকা তার আয়ত্তে আসে।
বংশপরম্পরায় মান্না লাল রায়ের নাতি ধনপতি লাল জমিদার হন। ধনপতি রায়ের নাতি উপেন্দ্র লাল রায় জমিদারি গ্রহণের পর অল্প বয়সে মারা যান। তখন জমিদারির দায়িত্ব তার কাকা 'মুনসেফ' গিরিধারী লাল রায়ের হাতে আসে। তিনি নিঃসন্তান হওয়ার কারণে কলকাতার গোবিন্দ লালকে দত্তক হিসেবে গ্রহণ করেন।
গোবিন্দ লাল ১৮৭৯ সালে এই জমিদারির উত্তরাধিকারী হন। পরে তিনি ১৮৮৫ সালে রাজা, ১৮৯২ সালে রাজাবাহাদুর এবং ১৮৯৬ সালে মহারাজা উপাধি লাভ করেন। ১৮৯৭ সালে ভূমিকম্পে নিজ বাড়ির ধ্বংসস্তূপের নিচে চাপা পড়ে তিনি মারা যান।
১৯০৮ সালে তার ছেলে মহারাজা কুমার গোপাল লাল রায় জমিদারির দায়িত্বভার গ্রহণ করেন। ১৯৪৭ সালে দেশভাগের পর মহারাজা কুমার গোপাল লাল রায় রাজবাড়ির মালপত্র গুছিয়ে ট্রেনে ভারতে যাওয়ার সময় কুষ্টিয়ায় হূদযন্ত্রের ক্রিয়া বন্ধ হয়ে মৃত্যুবরণ করেন। ছেলেমেয়েরা তার লাশ ও মালপত্র নিয়ে ভারতে চলে যান। এখন রাজবাড়িতে জমিদার আমলের কাঠের একটি টেবিল-চেয়ার ও ঝাড়বাতির অংশ আছে কালের সাক্ষী হয়ে।
মহারাজা কুমার গোপাল লাল রায় জমিদারির দায়িত্ব গ্রহণের পর বর্তমান ভবনটির নির্মাণ শুরু হয়। দক্ষ নকশাকার ছাড়াও সব মিলিয়ে কাজ করেন প্রায় দুই হাজার রাজমিস্ত্রী। ১৯১৭ সালে ভবনটি সম্পূর্ণ হয় এবং সে সময়ের হিসেবে এতে খরচ হয় প্রায় দেড় কোটি টাকা।
ইতালি থেকে আমদানিকৃত শ্বেতপাথর দিয়ে তৈরি করা হয়েছিল এ বাড়ির সম্মুখ সিঁড়িটি। এছাড়া ভবনের প্রধান প্রধান অংশ তৈরিতে ব্যবহার করা হয় লাল ইট, শ্বেতপাথর ও চুনাপাথর।
পুরো ভবনটিতে রয়েছে ২৮টি কক্ষ। ভবনের সামনে মার্বেল পাথরের সুদৃশ্য একটি ফোয়ারা আজো বিদ্যমান। ঢাকার আহ্ছান মঞ্জিলের মতো দেখতে এ জমিদার বাড়ির তৃতীয় ও চতুর্থ তলায় রয়েছে রাজা গোপালের ব্যবহূত নানা জিনিস।
১৯৫২ সালে জমিদারি প্রথা বিলুপ্ত হওয়ার পরে এ বাড়ি চলে যায় কৃষি বিভাগের অধীনে এবং এখানে গড়ে ওঠে কৃষি প্রশিক্ষণ ইনস্টিটিউট।
মুক্তিযুদ্ধের সময় এ বাড়ির প্রচুর মূল্যবান সম্পদ খোয়া যায়। ১৯৮৫ সালে এখানে হাইকোর্টের একটি বেঞ্চ চালু হয়। পরবর্তীতে ১৯৮৭ সালে তাজহাট জমিদার বাড়ি রূপান্তর করা হয় জাদুঘরে। আর এর নাম রংপুর জাদুঘর। এ জাদুঘরে ৩০০টি মূল্যবান নিদর্শন রয়েছে।
দোতলার সংগ্রহশালায় দুই হাজার বছরের পুরনো ছাদ, 'কচিকা পাথর'। বেগম রোকেয়ার চিঠি, তুলট কাগজে লেখা সংস্কৃত হস্তলিপি, পাঁচ কালেমার শাহাদাত উত্কীর্ণ আরবি শিলালিপি, ৬৯ হিজরির পোড়ামাটির লিপি, ১২০০ খ্রিস্টাব্দের শিলালিপি, ১৬৯১ সালের কালো পাথরের সংস্কৃতি শিলালিপি, এক দশমিক ৫ ইঞ্চি দৈর্ঘ্য, এক ইঞ্চি প্রস্থ ও আধা ইঞ্চি পুরো কোরআন শরিফ, পোড়ামাটির সীলমোহর, মাটির পাত্র, বৃহত্ হাতির দাঁত ও হাতির দাঁতের পাশা, বিভিন্ন আকার ও সময়ের অনেক বিষ্ণুমূর্তিসহ নিদর্শন।
মূল ফটকে জনপ্রতি ১০ টাকা টিকিট কেটে প্রবেশ করতে হয়। মূল জাদুঘরে ছবি তোলার অনুমতি নেই। প্রাসাদের বাইরে ছবি তোলা যাবে।
ভাওয়াইয়া গান আর ব্রিটিশবিরোধী আন্দোলনের কেন্দ্র রংপুরে তাজহাট রাজবাড়িসহ রাজা রামমোহন রায় ও বেগম রোকেয়ার বাড়ি, শাহ সুলতান গাজীর মসজিদ, জেলার দর্শনীয় স্থানগুলোর মধ্যে আছে চিকলির বিল, রংপুর বিশ্ববিদ্যালয়, কারমাইকেল কলেজ, কেরামতিয়া মসজিদ, মিঠাপুকুর মসজিদ, শতরঞ্জির পল্লী রয়েছে দেখার মতো।

0 comments:
একটি মন্তব্য পোস্ট করুন