দ্রুতগামী টিউব ট্রেনে করে মাটির নিচে ঘুরতে ঘুরতে মাটির ওপরের ছবিটা কল্পনা করা বেশ কঠিন এবং তারচেয়েও বেশি কঠিন ওখানে থাকা আশি লক্ষ অধিবাসীর সম্পর্কে জানা। কিন্তু লন্ডন ভাষার বৈচিত্র্যের দিক থেকে সমগ্র বিশ্বের মধ্যে অন্যতম একটি চমৎকার শহর । এ শহরে ব্যবহৃত ভাষার সংখ্যা একশোর-ও বেশি।
লন্ডনে বহু ভাষার স্বাদ পাওয়ার একটা পথ হচ্ছে পাতাল রেলের ভিক্টোরিয়া লাইনের ট্রেনে চড়ে বসা এবং বিভিন্ন স্টেশনে নেমে তা উপভোগ করা। এই রেল লাইন উত্তর-দক্ষিণ বরাবর ১৩ কি.মি.দীর্ঘ। শহরের ধনী ও দরিদ্র, এবং নতুন ও পুরোনা অভিবাসীদের মহল্লার মধ্য দিয়ে এই রেল চলাচল করে।
বিভিন্ন মানুষের সঙ্গে পরিচিত হোন:
শহরের কেন্দ্রে রয়েছেন ফরাসি আর আরবি ভাষাভাষীরা, দক্ষিণে গেলে পর্তুগিজ ভাষাভাষি, পরিবহণ ব্যবস্থার কেন্দ্রস্থলের চারপাশে ইউস্টন ও কিংস ক্রস-এ বাংলা ভাষাভাষিদের কথা শুনতে শুনতে এগিয়ে গেলে সবশেষে শুনবেন উত্তর প্রান্তে থাকা তুর্কি আর পোলিশ ভাষাভাষিদের কথা ।
বাংলা ভাষাভাষি : মোহাম্মাদ সালিক
বাংলাদেশি বংশোদ্ভূত অনেকেই ইউস্টন রেলস্টেশনের আশপাশের এলাকায় বাস করতে এসেছেন। এটি একটি প্রধান রেলস্টেশন যেটি রাজধানীকে দেশের উত্তরাঞ্চলের সাথে যুক্ত করে।
স্থানীয় একজন নেতা মোহাম্মাদ সালিকি বলেন, এর প্রধান কারণ পেটে খিদে নিয়ে যারা ভ্রমণ করেন, ভারতীয় উপ-মহাদেশের খাবারের প্রতি তাদের ভালোলাগা। ট্রেনে ওঠার আগে যাত্রীরা এখান থেকে তৈরি খাবার কিনে নেন। তিনি বলেন, এটাই আমার বাড়ি।
সালিকি যে সম্প্রদায়ের প্রতিনিধিত্ব করেন সেটি ছোট কিন্তু লন্ডনে বসবাসকারী বাংলা ভাষাভাষিদের মধ্যে এর অবস্থান বেশ শক্ত । ইউস্টন ও কিংস ক্রস-এর আশেপাশের অন্তত ২০% মানুষ বলেছেন যে তাদের প্রধান ভাষা বাংলা।
কিন্তু যে এলাকায় বাংলা সবচেয়ে বেশি প্রচলিত সেটি হল টাওয়ার হ্যামলেটস্, মানচিত্রে ভিক্টোরিয়া লাইনের পূর্বদিকে যার সীমানা প্রায় সঠিকভাবে গাঢ় লাল রঙে চিহ্ণিত করা হয়েছে। পূর্বদিকের নিউহ্যাম পৌর এলাকা হল এই সম্প্রদায়ের লোকজনের দ্বিতীয় বড় আবাসস্থল।
টাওয়ার হ্যামলেটসের কিছু কিছু অংশে বাংলা প্রধান ভাষা হিসেবে ব্যবহারকারী লোকের সংখ্যা প্রায় ৩৮% যেটি ভিক্টোরিয়া লাইন-এ পাওয়া অন্য যে কোন ভাষাভাষি মানুষের মধ্যে তুলনামুলকভাবে বেশি।
পর্তুগিজ ভাষাভাষি: লুসি ও ব্রেন্ডা সিনোত্তি
ব্রাজিলীয় বংশোদ্ভূত একজন লন্ডনবাসী লুসি বলেন, আমি আট বছর আগে লন্ডনে চলে আসি এবং আমি সরাসরি ব্রিক্সটনেই আসি। এখানে আপনি অনেক ব্রাজিলীয়, পর্তুগিজ এবং ইতালীয় লোকজন পাবেন।
বহুকাল ধরে ভিক্টোরিয়া লাইনের দক্ষিণপ্রান্ত, বিশেষ করে স্টকওয়েল ও ভক্সল-এর মধ্যবর্তী অঞ্চলটি লন্ডনে বসবাসকারী পর্তুগিজ ভাষাভাষিদের প্রাণকেন্দ্রে পরিণত হয়েছে এবং এই অঞ্চলটি বিগত কয়েক দশকে বেশ দ্রুতগতিতে বিস্তার লাভ করে ব্রিক্সটনের কাছাকাছি পৌঁছে গিয়েছে।
জনগণনার সময় কিছু কিছু অংশে ১৩% মানুষ বলেছে তাদের প্রধান ভাষা পর্তুগিজ এবং ৬৫% বলেছে যে তাদের প্রধান ভাষা ইংরেজি। এছাড়াও শহরের কেন্দ্রস্থলের উত্তর- পশ্চিমে ব্রেন্ট পৌর এলাকাতেও রয়েছে পর্তুগিজ ভাষাভাষিদের দ্বিতীয় একটি বড় ঘাঁটি।
ফরাসি ভাষাভাষি : মিরিয়াম ব্যালে
তার কাছে লন্ডনকে মনে হয় অনেক বেশি কসমোপলিটান বা বহু সংস্কৃতির শহর ও গ্রহণযোগ্য। তাই ১৯৯৪ সাল থেকে এ শহরটিকে তিনি নিজের ঘর করে নিয়েছেন।
ফরাসি বংশোদ্ভূত মিরিয়াম ব্যালে বলেন, আমার জন্ম ও বেড়ে ওঠা প্যারিসে এবং আমার গায়ের রং ওখানে একটা বড় সমস্যা হয়ে দাঁড়ায়।
তথ্য অনুযায়ী পশ্চিম লন্ডনের কেন্সিংটন ফ্রান্সের মানুষদের জন্য মনের দিক দিয়ে দ্বিতীয় আবাসস্থল।
মিস ব্যালে বলেন, সেখানে সমস্ত ধনী লোকেদের বাস। কিন্তু এই এলাকার বাইরে, ফরাসিরা ভিক্টোরিয়া লাইনে বসবাসকারীদের মধ্যে সমানভাবে ছড়িয়ে আছেন।
এই সমবণ্টন ব্যাখ্যা করতে গিয়ে ইউসিএল এর ভূগোল বিভাগের গবেষক অলিভার ও'ব্রায়ান, যিনি আগে এই তথ্যগুলো নিয়ে গবেষণা করেছেন, বলেন যে, ফ্রান্স থেকে যারা এখানে নতুন আসছেন তাদের মনোভাব এখন ভিন্ন - তাদের মনে হয় না যে নিজেদের লোকেদের মধ্যেই থাকতে হবে- কারণ লন্ডনের পরিবেশ হয়তো ইতিমধ্যেই তাদের কাছে বেশ পরিচিতই মনে হয়।
যদিও প্রধান ভাষাগুলোর পাশাপাশি পেশা সম্পর্কিত তথ্যগুলো প্রকাশিত হয়নি, কিন্তু মিঃ ব্রায়ান লক্ষ্য করেছেন যে বিশ্বের অনেক দেশ থেকেই নানা পেশার মানুষ এখন এখানে ভিড় করছেন। এদের মধ্যে ফরাসি ভাষাভাষি বিনিয়োগ ব্যাংকাররা লন্ডন শহরের ব্যাংক পাড়ায় তাদের অফিসের কাছাকাছি বাসা নিচ্ছেন। এই এলাকা ভিক্টোরিয়া লাইনের পূর্বে ও টেমস নদীর উত্তরে পাশে অবস্থিত।
উপরের চিত্রগুলো নেয়া হয়েছে লন্ডনের সেন্ট প্যাংক্রাস রেল স্টেশন থেকে। এখান থেকেই বেলজিয়াম ও প্যারিসের উদ্দেশ্যে ট্রেনগুলো ছেড়ে যায়। এই জায়গাটা প্যারিসের দিকের রেল স্টেশনের থেকে ভাল- তুলনা করতে গিয়ে মিস ব্যালে বলেন, এই জায়গাটা কতো সুন্দর ও পরিস্কার। যখনই আপনি প্যারিসে পৌঁছবেন অাপনার মনে বিতৃষ্ণা চলে আসবে এবং মনে প্রশ্ন জাগবে, ইস্ এটা কি সত্যিই প্যারিস?
আরবি ভাষাভাষীঃ আহ্লাম আকরাম
তিনি বলেন, ১৯৭৯ সালে আমি যখন প্রথম লন্ডনে আসি, আমরা মাত্র অল্প কিছু মানুষ ছিলাম। আমাদের তখন মানসিক সমর্থনের প্রয়োজন ছিল।
আমি অন্যতম একজন সৌভাগ্যবান- আমি লন্ডনে বাস করি।
লন্ডনের খাবারের ব্যবসায় মধ্যপ্রাচ্যের খাবারের প্রভাব সুস্পষ্ট। বিশেষ করে এজওয়ার রোড বরাবর মধ্যপ্রাচ্যের খাবারের রেস্তোরাঁ ও শীশা ক্যাফেগুলো এর জ্বলন্ত উদাহরণ। এই এলাকার কোনো কোনো জায়গায় আরবি ভাষাভাষি লোকজনদের সংখ্যা প্রায় ২৩%।
তবে লন্ডনের মধ্যভাগের বেশ কিছু অঞ্চলে, বিশেষ করে যে অঞ্চলগুলো শহরের পশ্চিমদিকে, সেখানে প্রচুর আরবি ভাষাভাষি লোকজন রয়েছে। গ্রিনপার্ক স্টেশনের চারপাশের এলাকাগুলোর অধিবাসীদের মধ্যে ৬% মানুষের প্রধান ভাষা আরবি। এই এলাকা বাড়ির দামের দিক দিয়ে বিশ্বের সবচেয়ে ব্যয়বহুল অঞ্চলগুলোর মধ্যে একটি।
তুর্কি ভাষাভাষি : ক্যান ও আলি গুল
ভিক্টোরিয়া লাইনের যাত্রাপথে ফিন্সবেরি পার্ক থেকে টটেনঅ্যাম হেল পর্যন্ত তুর্কি একটি অন্যতম জনপ্রিয় ভাষা, কিন্তু আলি গুলের মতে এটিই এই শহরের ভাষার দিক দিয়ে সবচেয়ে বৈচিত্র্যপূর্ণ অঞ্চল। এই রাস্তায় প্রায় ২০০ ধরনের ভাষায় কথা বলা হয়। গ্রীন লেনস্, যেটি ভিক্টোরিয়া লাইনকে ছেদ করে ঠিক তার মাঝ দিয়ে চলে যাওয়া একটি উঁচু রাস্তা, সে রাস্তা সম্পর্কে বলতে গিয়ে তিনি একথা বলেন।
কিন্তু এই রাস্তাটি তুর্কি রেস্তোরাঁগুলোর জন্য সুপরিচিত হলেও, এখান থেকে আরও ছয় মাইল উত্তরের এনফিল্ড টাউনের অধিবাসীরাই মূলত তুর্কি ভাষাকে তাদের প্রধান ভাষা হিসেবে ব্যবহার করে থাকে।
লন্ডনে বসবাসরত তুর্কি ভাষাভাষিরা নিজেদের মূলত তিনটি পৌর অঞ্চলে সীমাবদ্ধ রেখেছে- হ্যাকনি, হ্যারিঙ্গে এবং এনফিল্ড- যা রিভার লি-এর পশ্চিম পাড় সংলগ্ন। এই নদীটি উত্তর-পূর্ব লন্ডনের উপকণ্ঠ থেকে উৎপত্তি হয়ে স্স্ট্রাটফোর্ড-এর মধ্য দিয়ে প্রবাহিত হয়ে টেমস- এ মিশেছে।
পোলিশ ভাষাভাষি : ভিওলা
ভিওলা বলেন, আমি এখনও পোলিশ ভাষাতেই চিন্তা করি, স্বপ্ন দেখি এবং এই ভাষাতেই প্রার্থনা করি।
জনগণনা জরিপে লিপিবদ্ধ বেশিরভাগ পোলিশদের মতো তিনিও ২০০১ থেকে ২০১১ এর মধ্যে লন্ডনে এসেছেন।
২০০৪ সালে যখন পোল্যান্ড ইউরোপীয় ইউনিয়ন-এ যোগ দেয় তখনই লন্ডনের জমির মূল্য ছিল খুব চড়া এবং দিনে দিনে তা আরও বৃদ্ধি পেয়েছে। হয়তো এজন্যই পোলিশ ভাষাভাষিরা লন্ডনের উপকণ্ঠের বিভিন্ন অঞ্চলে বসবাস করতে শুরু করে।
যদিও মূলত পশ্চিম লন্ডনের ইলিং-এর আশেপাশেই পোলিশদের ঘনবসতি, কিন্তু ভিক্টোরিয়া লাইনের উত্তর প্রান্তের কিছু কিছু অঞ্চলেও পোলিশ ভাষাভাষিরা তাদের বসতি গড়ে তুলেছেন।
২১০ বছরের ইতিহাসে প্রথমবার, ২০১১ সালের জনগণনার সময় অধিবাসীদের তাদের প্রধান ভাষা সম্পর্কে জিজ্ঞেস করা হয়।
লন্ডনের প্রায় সব অংশের উত্তরদাতাদের গরিষ্ঠসংখ্যকের প্রধান ভাষা ছিল ইংরেজি।
কিন্তু এই তথ্যগুলো থেকে আমরা আরও দেখতে পাই যে বর্তমানে লন্ডনে বসবাসরত বাইরে থাকা আসা অধিবাসীদের মধ্যে কারা কারা এখনও তাদের মাতৃভাষার প্রতি বিশ্বস্ত। এবং ব্রাজিলীয় ও পর্তুগিজ যাদের ভাষাগত ঐতিহ্য অভিন্ন তারা কীভাবে একই এলাকায় একতাবদ্ধ হয়ে বাস করতে শুরু করে। এই নিবন্ধটি মূলত টিউব রুট বরাবর সবচেয়ে বেশি ব্যবহৃত ভাষাগুলোর মধ্যে কয়েকটিকে নিয়ে তথ্য প্রকাশ করেছে। তবে এখানে আলোচিত ভাষাগুলো বাদেও আরও অনেক ভাষা রয়েছে।
সেন্ট্রাল লন্ডনের ভাষাগত বৈচিত্র্য নিম্নোক্ত মানচিত্রের সাহায্যে সহজে তুলে ধরা হলো। ভিক্টোরিয়া লাইনে পড়ে এমন বহু এলাকায় ১১টি বিভিন্ন ভাষা প্রধান ভাষা হিসাবে লিপিবদ্ধ করা হয়েছে যেগুলোর প্রতিটা কমপক্ষে ১% লোকের প্রধান ভাষা হিসেবে ব্যবহৃত হয়।
ক্রেডিটস্: ডিজাইন করেছেন লরা ক্যানটাডোরি, জেমস্ অফার ও শার্লট থর্নটন। ডেভেলপ করেছেন রিচার্ড ব্যাঙ্গে ও মারসেলো যান্নি। ভিডিও সাক্ষাৎকার নিয়েছেন জো ইনউড, স্টেফানি হেগারটি, ও ভ্লাদিমির হারনান্দেয। অডিও সাউন্ডস্কেপ করেছেন এমা ক্রো। রচনা ও প্রযোজনা এড লাউথার।
সূত্র: বিবিসি বাংলা অনলাইন।
লন্ডনে বহু ভাষার স্বাদ পাওয়ার একটা পথ হচ্ছে পাতাল রেলের ভিক্টোরিয়া লাইনের ট্রেনে চড়ে বসা এবং বিভিন্ন স্টেশনে নেমে তা উপভোগ করা। এই রেল লাইন উত্তর-দক্ষিণ বরাবর ১৩ কি.মি.দীর্ঘ। শহরের ধনী ও দরিদ্র, এবং নতুন ও পুরোনা অভিবাসীদের মহল্লার মধ্য দিয়ে এই রেল চলাচল করে।
বিভিন্ন মানুষের সঙ্গে পরিচিত হোন:
শহরের কেন্দ্রে রয়েছেন ফরাসি আর আরবি ভাষাভাষীরা, দক্ষিণে গেলে পর্তুগিজ ভাষাভাষি, পরিবহণ ব্যবস্থার কেন্দ্রস্থলের চারপাশে ইউস্টন ও কিংস ক্রস-এ বাংলা ভাষাভাষিদের কথা শুনতে শুনতে এগিয়ে গেলে সবশেষে শুনবেন উত্তর প্রান্তে থাকা তুর্কি আর পোলিশ ভাষাভাষিদের কথা ।
বাংলা ভাষাভাষি : মোহাম্মাদ সালিক
বাংলাদেশি বংশোদ্ভূত অনেকেই ইউস্টন রেলস্টেশনের আশপাশের এলাকায় বাস করতে এসেছেন। এটি একটি প্রধান রেলস্টেশন যেটি রাজধানীকে দেশের উত্তরাঞ্চলের সাথে যুক্ত করে।
স্থানীয় একজন নেতা মোহাম্মাদ সালিকি বলেন, এর প্রধান কারণ পেটে খিদে নিয়ে যারা ভ্রমণ করেন, ভারতীয় উপ-মহাদেশের খাবারের প্রতি তাদের ভালোলাগা। ট্রেনে ওঠার আগে যাত্রীরা এখান থেকে তৈরি খাবার কিনে নেন। তিনি বলেন, এটাই আমার বাড়ি।
সালিকি যে সম্প্রদায়ের প্রতিনিধিত্ব করেন সেটি ছোট কিন্তু লন্ডনে বসবাসকারী বাংলা ভাষাভাষিদের মধ্যে এর অবস্থান বেশ শক্ত । ইউস্টন ও কিংস ক্রস-এর আশেপাশের অন্তত ২০% মানুষ বলেছেন যে তাদের প্রধান ভাষা বাংলা।
কিন্তু যে এলাকায় বাংলা সবচেয়ে বেশি প্রচলিত সেটি হল টাওয়ার হ্যামলেটস্, মানচিত্রে ভিক্টোরিয়া লাইনের পূর্বদিকে যার সীমানা প্রায় সঠিকভাবে গাঢ় লাল রঙে চিহ্ণিত করা হয়েছে। পূর্বদিকের নিউহ্যাম পৌর এলাকা হল এই সম্প্রদায়ের লোকজনের দ্বিতীয় বড় আবাসস্থল।
টাওয়ার হ্যামলেটসের কিছু কিছু অংশে বাংলা প্রধান ভাষা হিসেবে ব্যবহারকারী লোকের সংখ্যা প্রায় ৩৮% যেটি ভিক্টোরিয়া লাইন-এ পাওয়া অন্য যে কোন ভাষাভাষি মানুষের মধ্যে তুলনামুলকভাবে বেশি।
পর্তুগিজ ভাষাভাষি: লুসি ও ব্রেন্ডা সিনোত্তি
ব্রাজিলীয় বংশোদ্ভূত একজন লন্ডনবাসী লুসি বলেন, আমি আট বছর আগে লন্ডনে চলে আসি এবং আমি সরাসরি ব্রিক্সটনেই আসি। এখানে আপনি অনেক ব্রাজিলীয়, পর্তুগিজ এবং ইতালীয় লোকজন পাবেন।
বহুকাল ধরে ভিক্টোরিয়া লাইনের দক্ষিণপ্রান্ত, বিশেষ করে স্টকওয়েল ও ভক্সল-এর মধ্যবর্তী অঞ্চলটি লন্ডনে বসবাসকারী পর্তুগিজ ভাষাভাষিদের প্রাণকেন্দ্রে পরিণত হয়েছে এবং এই অঞ্চলটি বিগত কয়েক দশকে বেশ দ্রুতগতিতে বিস্তার লাভ করে ব্রিক্সটনের কাছাকাছি পৌঁছে গিয়েছে।
জনগণনার সময় কিছু কিছু অংশে ১৩% মানুষ বলেছে তাদের প্রধান ভাষা পর্তুগিজ এবং ৬৫% বলেছে যে তাদের প্রধান ভাষা ইংরেজি। এছাড়াও শহরের কেন্দ্রস্থলের উত্তর- পশ্চিমে ব্রেন্ট পৌর এলাকাতেও রয়েছে পর্তুগিজ ভাষাভাষিদের দ্বিতীয় একটি বড় ঘাঁটি।
ফরাসি ভাষাভাষি : মিরিয়াম ব্যালে
তার কাছে লন্ডনকে মনে হয় অনেক বেশি কসমোপলিটান বা বহু সংস্কৃতির শহর ও গ্রহণযোগ্য। তাই ১৯৯৪ সাল থেকে এ শহরটিকে তিনি নিজের ঘর করে নিয়েছেন।
ফরাসি বংশোদ্ভূত মিরিয়াম ব্যালে বলেন, আমার জন্ম ও বেড়ে ওঠা প্যারিসে এবং আমার গায়ের রং ওখানে একটা বড় সমস্যা হয়ে দাঁড়ায়।
তথ্য অনুযায়ী পশ্চিম লন্ডনের কেন্সিংটন ফ্রান্সের মানুষদের জন্য মনের দিক দিয়ে দ্বিতীয় আবাসস্থল।
মিস ব্যালে বলেন, সেখানে সমস্ত ধনী লোকেদের বাস। কিন্তু এই এলাকার বাইরে, ফরাসিরা ভিক্টোরিয়া লাইনে বসবাসকারীদের মধ্যে সমানভাবে ছড়িয়ে আছেন।
এই সমবণ্টন ব্যাখ্যা করতে গিয়ে ইউসিএল এর ভূগোল বিভাগের গবেষক অলিভার ও'ব্রায়ান, যিনি আগে এই তথ্যগুলো নিয়ে গবেষণা করেছেন, বলেন যে, ফ্রান্স থেকে যারা এখানে নতুন আসছেন তাদের মনোভাব এখন ভিন্ন - তাদের মনে হয় না যে নিজেদের লোকেদের মধ্যেই থাকতে হবে- কারণ লন্ডনের পরিবেশ হয়তো ইতিমধ্যেই তাদের কাছে বেশ পরিচিতই মনে হয়।
যদিও প্রধান ভাষাগুলোর পাশাপাশি পেশা সম্পর্কিত তথ্যগুলো প্রকাশিত হয়নি, কিন্তু মিঃ ব্রায়ান লক্ষ্য করেছেন যে বিশ্বের অনেক দেশ থেকেই নানা পেশার মানুষ এখন এখানে ভিড় করছেন। এদের মধ্যে ফরাসি ভাষাভাষি বিনিয়োগ ব্যাংকাররা লন্ডন শহরের ব্যাংক পাড়ায় তাদের অফিসের কাছাকাছি বাসা নিচ্ছেন। এই এলাকা ভিক্টোরিয়া লাইনের পূর্বে ও টেমস নদীর উত্তরে পাশে অবস্থিত।
উপরের চিত্রগুলো নেয়া হয়েছে লন্ডনের সেন্ট প্যাংক্রাস রেল স্টেশন থেকে। এখান থেকেই বেলজিয়াম ও প্যারিসের উদ্দেশ্যে ট্রেনগুলো ছেড়ে যায়। এই জায়গাটা প্যারিসের দিকের রেল স্টেশনের থেকে ভাল- তুলনা করতে গিয়ে মিস ব্যালে বলেন, এই জায়গাটা কতো সুন্দর ও পরিস্কার। যখনই আপনি প্যারিসে পৌঁছবেন অাপনার মনে বিতৃষ্ণা চলে আসবে এবং মনে প্রশ্ন জাগবে, ইস্ এটা কি সত্যিই প্যারিস?
আরবি ভাষাভাষীঃ আহ্লাম আকরাম
তিনি বলেন, ১৯৭৯ সালে আমি যখন প্রথম লন্ডনে আসি, আমরা মাত্র অল্প কিছু মানুষ ছিলাম। আমাদের তখন মানসিক সমর্থনের প্রয়োজন ছিল।
আমি অন্যতম একজন সৌভাগ্যবান- আমি লন্ডনে বাস করি।
লন্ডনের খাবারের ব্যবসায় মধ্যপ্রাচ্যের খাবারের প্রভাব সুস্পষ্ট। বিশেষ করে এজওয়ার রোড বরাবর মধ্যপ্রাচ্যের খাবারের রেস্তোরাঁ ও শীশা ক্যাফেগুলো এর জ্বলন্ত উদাহরণ। এই এলাকার কোনো কোনো জায়গায় আরবি ভাষাভাষি লোকজনদের সংখ্যা প্রায় ২৩%।
তবে লন্ডনের মধ্যভাগের বেশ কিছু অঞ্চলে, বিশেষ করে যে অঞ্চলগুলো শহরের পশ্চিমদিকে, সেখানে প্রচুর আরবি ভাষাভাষি লোকজন রয়েছে। গ্রিনপার্ক স্টেশনের চারপাশের এলাকাগুলোর অধিবাসীদের মধ্যে ৬% মানুষের প্রধান ভাষা আরবি। এই এলাকা বাড়ির দামের দিক দিয়ে বিশ্বের সবচেয়ে ব্যয়বহুল অঞ্চলগুলোর মধ্যে একটি।
তুর্কি ভাষাভাষি : ক্যান ও আলি গুল
ভিক্টোরিয়া লাইনের যাত্রাপথে ফিন্সবেরি পার্ক থেকে টটেনঅ্যাম হেল পর্যন্ত তুর্কি একটি অন্যতম জনপ্রিয় ভাষা, কিন্তু আলি গুলের মতে এটিই এই শহরের ভাষার দিক দিয়ে সবচেয়ে বৈচিত্র্যপূর্ণ অঞ্চল। এই রাস্তায় প্রায় ২০০ ধরনের ভাষায় কথা বলা হয়। গ্রীন লেনস্, যেটি ভিক্টোরিয়া লাইনকে ছেদ করে ঠিক তার মাঝ দিয়ে চলে যাওয়া একটি উঁচু রাস্তা, সে রাস্তা সম্পর্কে বলতে গিয়ে তিনি একথা বলেন।
কিন্তু এই রাস্তাটি তুর্কি রেস্তোরাঁগুলোর জন্য সুপরিচিত হলেও, এখান থেকে আরও ছয় মাইল উত্তরের এনফিল্ড টাউনের অধিবাসীরাই মূলত তুর্কি ভাষাকে তাদের প্রধান ভাষা হিসেবে ব্যবহার করে থাকে।
লন্ডনে বসবাসরত তুর্কি ভাষাভাষিরা নিজেদের মূলত তিনটি পৌর অঞ্চলে সীমাবদ্ধ রেখেছে- হ্যাকনি, হ্যারিঙ্গে এবং এনফিল্ড- যা রিভার লি-এর পশ্চিম পাড় সংলগ্ন। এই নদীটি উত্তর-পূর্ব লন্ডনের উপকণ্ঠ থেকে উৎপত্তি হয়ে স্স্ট্রাটফোর্ড-এর মধ্য দিয়ে প্রবাহিত হয়ে টেমস- এ মিশেছে।
পোলিশ ভাষাভাষি : ভিওলা
ভিওলা বলেন, আমি এখনও পোলিশ ভাষাতেই চিন্তা করি, স্বপ্ন দেখি এবং এই ভাষাতেই প্রার্থনা করি।
জনগণনা জরিপে লিপিবদ্ধ বেশিরভাগ পোলিশদের মতো তিনিও ২০০১ থেকে ২০১১ এর মধ্যে লন্ডনে এসেছেন।
২০০৪ সালে যখন পোল্যান্ড ইউরোপীয় ইউনিয়ন-এ যোগ দেয় তখনই লন্ডনের জমির মূল্য ছিল খুব চড়া এবং দিনে দিনে তা আরও বৃদ্ধি পেয়েছে। হয়তো এজন্যই পোলিশ ভাষাভাষিরা লন্ডনের উপকণ্ঠের বিভিন্ন অঞ্চলে বসবাস করতে শুরু করে।
যদিও মূলত পশ্চিম লন্ডনের ইলিং-এর আশেপাশেই পোলিশদের ঘনবসতি, কিন্তু ভিক্টোরিয়া লাইনের উত্তর প্রান্তের কিছু কিছু অঞ্চলেও পোলিশ ভাষাভাষিরা তাদের বসতি গড়ে তুলেছেন।
২১০ বছরের ইতিহাসে প্রথমবার, ২০১১ সালের জনগণনার সময় অধিবাসীদের তাদের প্রধান ভাষা সম্পর্কে জিজ্ঞেস করা হয়।
লন্ডনের প্রায় সব অংশের উত্তরদাতাদের গরিষ্ঠসংখ্যকের প্রধান ভাষা ছিল ইংরেজি।
কিন্তু এই তথ্যগুলো থেকে আমরা আরও দেখতে পাই যে বর্তমানে লন্ডনে বসবাসরত বাইরে থাকা আসা অধিবাসীদের মধ্যে কারা কারা এখনও তাদের মাতৃভাষার প্রতি বিশ্বস্ত। এবং ব্রাজিলীয় ও পর্তুগিজ যাদের ভাষাগত ঐতিহ্য অভিন্ন তারা কীভাবে একই এলাকায় একতাবদ্ধ হয়ে বাস করতে শুরু করে। এই নিবন্ধটি মূলত টিউব রুট বরাবর সবচেয়ে বেশি ব্যবহৃত ভাষাগুলোর মধ্যে কয়েকটিকে নিয়ে তথ্য প্রকাশ করেছে। তবে এখানে আলোচিত ভাষাগুলো বাদেও আরও অনেক ভাষা রয়েছে।
সেন্ট্রাল লন্ডনের ভাষাগত বৈচিত্র্য নিম্নোক্ত মানচিত্রের সাহায্যে সহজে তুলে ধরা হলো। ভিক্টোরিয়া লাইনে পড়ে এমন বহু এলাকায় ১১টি বিভিন্ন ভাষা প্রধান ভাষা হিসাবে লিপিবদ্ধ করা হয়েছে যেগুলোর প্রতিটা কমপক্ষে ১% লোকের প্রধান ভাষা হিসেবে ব্যবহৃত হয়।
ক্রেডিটস্: ডিজাইন করেছেন লরা ক্যানটাডোরি, জেমস্ অফার ও শার্লট থর্নটন। ডেভেলপ করেছেন রিচার্ড ব্যাঙ্গে ও মারসেলো যান্নি। ভিডিও সাক্ষাৎকার নিয়েছেন জো ইনউড, স্টেফানি হেগারটি, ও ভ্লাদিমির হারনান্দেয। অডিও সাউন্ডস্কেপ করেছেন এমা ক্রো। রচনা ও প্রযোজনা এড লাউথার।
সূত্র: বিবিসি বাংলা অনলাইন।

0 comments:
একটি মন্তব্য পোস্ট করুন