হামলায় রক্তাক্ত প্যারিস

সন্ত্রাসীদের বেপরোয়া হামলায় ফ্রান্সের রাজধানী প্যারিসে শুক্রবার রাতে ১২৯ জন নিহত ও অন্তত সাড়ে ৩শ’ আহত হয়েছেন। আহতদের মধ্যে ১শ’ জনের অবস্থা আশংকাজনক। হতাহতের সংখ্যা আরও বাড়তে পারে।
শহরের কয়েকটি এলাকা এবং স্টেডিয়ামে প্রায় একই সময় এ হামলার ঘটনা ঘটে। এ হামলার দায়িত্ব স্বীকার করে বিবৃতি দিয়েছে আইএস (ইসলামিক স্টেট)। এ ঘটনায় দেশটিতে জারি করা হয়েছে জরুরি অবস্থা। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পর এই প্রথম দেশটিতে জরুরি অবস্থা জারি করা হল।
হামলার পর প্যারিসে কারফিউ ঘোষণা করেছে কর্তৃপক্ষ। ঘোষণা করা হয়েছে তিন দিনের জাতীয় শোক। বন্ধ করে দেয়া হয়েছে সীমান্ত। প্যারিসের মানুষকে রাস্তায় বের হতে বারণ করা হয়েছে। সংঘর্ষে অন্তত ৮ হামলাকারী নিহত হয়েছে বলে খবর পাওয়া গেছে।
হামলাকারীদের কাছ থেকে মিসর ও সিরিয়ার পাসপোর্ট পাওয়া গেছে। হামলাকারীদের একজনকে ফরাসি নাগরিক হিসেবে শনাক্ত করা হয়েছে। পুলিশকে সহায়তা করতে কমপক্ষে দেড় হাজার সৈন্য মোতায়েন করা হয়েছে।
প্যারিস ভ্রমণে বেলজিয়ামের নাগরিকদের সতর্কতা জারি করেছে দেশটির প্রধানমন্ত্রী চার্লস মিচেল।
বেলজিয়াম জানায়, প্যারিসের হামলায় সংশ্লিষ্টতার অভিযোগে ইতিমধ্যে কয়েকজনকে তারা আটক করেছে। খবর এএফপি, বিবিসি ও সিএনএনের।
প্যারিসে বাতিল করা হয়েছে পুলিশের ছুটি, হাসপাতালগুলোতে কর্মীদের নিরবচ্ছিন্ন কাজে রাখা হয়েছে। মেট্রোরেলের পাশাপাশি বন্ধ করে দেয়া হয়েছে সব শিক্ষা প্রতিষ্ঠান। মার্কেট, জাদুঘর, পর্যটন স্পটও বন্ধ করে দেয়া হয়েছে। আইফেল টাওয়ার বন্ধ করে দেয়া হয়েছে। শহরে শুধু চালু রয়েছে বিয়ে রেজিস্ট্রেশন।
হামলায় সন্ত্রাসীরা যে স্থানগুলো বেছে নেয় সেগুলো হল- স্টেড দ্য ফ্রান্স স্টেডিয়াম, ক্যামবোজ রেস্তোরাঁ, বলিভার্ড ভল্টেয়ার, বাটাক্লান থিয়েটার (রক কনসার্ট), রুয়ে ডি ফন্টেইন অ রই, রুয়ে ডি ছারনি (পাতাল রেলস্টেশন) ও রুয়ে ডি টার্মিস।
জার্মানির বিপক্ষে ফ্রান্সের ফুটবল টিমের খেলা চলার সময় স্টেড দ্য ফ্রান্স নামের স্টেডিয়ামটিতে বিস্ফোরণের শব্দও পাওয়া গেছে। সে সময় ফরাসি প্রেসিডেন্ট ফ্রাঁসোয়া ওলান্দ স্টেডিয়ামে বসে খেলা দেখছিলেন।
বাইরে বোমা হামলার পর খেলা চালিয়ে গেলেও স্টেডিয়ামের ভেতরে আতংক তৈরি হয়। ওই সময় গ্যালারিতে ওলান্দের সঙ্গে বসে খেলা দেখছিলেন জার্মান পররাষ্ট্রমন্ত্রী ফ্যাংক ভালটার।
বিস্ফোরণের পরপরই পুলিশের হেলিকপ্টারকে স্টেডিয়ামের ওপর চক্কর দিতে দেখা যায়। প্রেসিডেন্ট ওলান্দ দ্রুত চলে যান স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ে, সেখানে বসে সব পরিস্থিতি দেখে জরুরি অবস্থার ঘোষণা দেন তিনি।
বিবিসির এক সংবাদদাতা জানিয়েছেন, তিনি শহরের একটি এশিয়ান রেস্তোরাঁর সামনে অন্তত ১০ জনকে পড়ে থাকতে দেখেছেন।
এক প্রত্যক্ষদর্শী বলেছেন, তিনি একজন বন্দুকধারীকে আধা স্বয়ংক্রিয় বন্দুক দিয়ে গুলি চালাতে দেখেছেন।
ফ্রান্স পুলিশ জানিয়েছে, বাটাক্লান কনসার্ট হলে ১৫ জনকে হত্যা এবং ৬০ থেকে ১০০ জনের মতো লোককে জিম্মি করে অস্ত্রধারীরা। আমেরিকার একটি ব্যান্ডদলের কনসার্ট চলছিল তখন। হত্যা ও জিম্মির ঘটনার পর পুলিশ কনসার্ট হলের চারপাশ ঘিরে রাখে। পরে পুলিশ জিম্মিদের উদ্ধারে ভারি অস্ত্রসহকারে সন্ত্রাসীদের ওপর আক্রমণ চালায়। এতে ৩ অস্ত্রধারী মারা যায় এবং শুক্রবার মধ্যরাতে পরিস্থিতি নিজেদের নিয়ন্ত্রণে নিতে সক্ষম হয় পুলিশ। এ ঘটনায় ১০০ জনের মতো লোক মারা গেছেন।
প্যারিস থেকে সাংবাদিক জন লরেন্সন জানান, কনসার্ট হলে বিপুল হত্যাযজ্ঞের ঘটনা ঘটেছে। ফলে প্রথমদিকে মৃতের যে সংখ্যা ঘোষণা করা হয়েছিল তার চেয়ে অনেক বেশি লোক এতে মারা গেছেন।
মধ্য প্যারিসে অবস্থিত একটি রেস্টুরেন্টে একজন বন্দুকধারী গুলি চালিয়ে ১১ জনকে এবং প্যারিসের স্টেড দ্য ফ্রান্স স্টেডিয়ামের পাশে বোমা বিস্ফোরণে ৩ জন নিহত হয়েছেন। তবে কেউ কেউ বোমা বিস্ফোরণকে আত্মঘাতী হামলা বলে বর্ণনা করেছেন।
শহরের মাঝামাঝি বাটাক্লান কনসার্ট হলে মার্কিন ব্যান্ডদল ইগলস অব ডেথ মেটালের কনসার্ট দেখতে জড়ো হয়েছিলেন কয়েক হাজার মানুষ। এরই মধ্যে অন্তত তিন হামলাকারী হলে ঢুকে কালাশনিকভের মতো দেখতে রাইফেল নিয়ে নির্বিচারে গুলি চালাতে শুরু করে।
ইউরোপ ওয়ান রেডিওর সাংবাদিক জুলিয়ঁ পিয়ার্স বলেন, তারা নির্বিচারে গুলি চালাচ্ছিল। যে যেদিকে পারে দৌড়ে বাঁচার চেষ্টা করছিল। আমি বহু মানুষকে গুলি খেয়ে পড়ে যেতে দেখেছি।
জুলিয়ঁ পিয়ার্স বলেন, হামলাকারীরা সবাই ছিল বয়সে তরুণ। কারও মুখে মুখোশ ছিল না। অন্তত তিনবার তারা রাইফেলের ম্যাগাজিন বদলেছে।
কনসার্ট হলের বাইরে থাকা এক যুবক রয়টার্সকে বলেন, বন্দুকধারী তিন তরুণ ছিল কালো পোশাকধারী। তাদের হাতে ছিল মেশিনগান।
এই ভয়ংকর হত্যাযজ্ঞের পর হামলাকারীরা সেখানে শতাধিক মানুষকে জিম্মি করে। পরে পুলিশ অভিযান চালিয়ে জিম্মি সংকটের রক্তাক্ত অবসান ঘটায়।
ওই কনসার্ট হলের কয়েকশ’ মিটারের মধ্যে বিদ্রুপ সাময়িকী শার্লি এবদুর কার্যালয়। ১০ মাস আগে সেখানে বন্দুকধারীরা হামলা চালিয়ে ২০ জনকে হত্যা করেছিল।
স্টেডিয়ামের বাইরে ম্যাকডোনাল্ডসের দোকানের সামনে দুটি বিস্ফোরণ ঘটে। সেখানে আত্মঘাতী বোমা হামলা হয় বলে প্রত্যক্ষদর্শীরা জানিয়েছেন। রেস্তোরাঁর বাইরের অংশে তখন অনেকেই ডিনার খেতে বসেছিলেন।
আইএস এক বিবৃতিতে জানিয়েছে, ইরাক-সিরিয়ায় হামলার বদলা নিতে প্যারিসে হামলা চালানো হয়েছে। হামলা অব্যাহত থাকলে তারা ফ্রান্সে আরও হামলার হুশিয়ারি দিয়েছে।
এদিকে ভ্রমণ সতর্কতায় বেলজিয়ামের প্রধানমন্ত্রী বলেন, এ মুহূর্তে আমাদের প্যারিস ভ্রমণ এড়িয়ে চলতে হবে। আরটিবিএফ টেলিভিশনে তিনি আরও বলেন, আমি আমার দেশের নাগরিকদের একটি বার্তা দিচ্ছি। ২০০৪ সালে মাদ্রিদে ট্রেনে বোমা হামলার পর ইউরোপে এটাই সন্ত্রাসী হামলার সবচেয়ে বড় ঘটনা।
হামলাকারীদের মধ্যে ফ্রান্স, মিসর ও সিরিয়ার নাগরিক ছিল : প্যারিসে হামলাকারীদের কাছে মিসর ও সিরিয়ার পাসপোর্ট পাওয়া গেছে বলে ফরাসি একটি দৈনিকের বরাত দিয়ে জানিয়েছে বিবিসি। এছাড়া হামলাকারীদের একজনকে তার আঙ্গুলের ছাপ পরীক্ষা করে ফরাসি নাগরিক বলে চিহ্নিত করেছে দেশটির পুলিশ। সূত্র: যুগান্তর
Share on Google Plus

About MONOJ SARKER

This is a short description in the author block about the author. You edit it by entering text in the "Biographical Info" field in the user admin panel.

0 comments:

একটি মন্তব্য পোস্ট করুন