নীল সাদা লালেই কি যত রাগ জঙ্গিদের? হালকা সুরেই প্রশ্নটা পেড়েছিল Kolkata 24X7-এর সম্পাদক রানা দাস। প্রথমে স্বভাবসিদ্ধভাবেই উড়িয়ে দিয়েছিলাম৷কিন্তু তার পরেই এল সেকেন্ড থট৷
রানা একেবারেই ভুল বলেনি৷ সত্যিই নীল সাদা লালেই যত আক্রোশ সন্ত্রাসবাদীদের৷তার কারণ, এই রঙের ছটাতেই তো পৃথিবীতে ছড়িয়ে পড়েছিল মানবসভ্যতার প্রথম মুক্তির বাণী: লিবার্তে, ইগালিতে, ফ্রেতারনিতে (মুক্তি, সাম্য, ভ্রাতৃত্ব)৷
এই নীল সাদা লাল-ই তো প্রথম উড়েছিল আমেরিকার মাটিতে৷ জর্জ ওয়াশিংটনের নেতৃত্বে৷ ব্রিটিশ উপনিবেশবাদীদের ঝেঁটিয়ে বিষ ঝেড়ে দিয়েছিলেন জর্জ ওয়াশিংটন আর তার সঙ্গীরা৷
১৭৭৭ সালে সেখানকার ১৩টি ব্রিটিশ কলোনি প্রথম স্বাধীনতা ঘোষণা করে যে জাতীয় পতাকার জন্ম দিয়েছিল তারও রং আদতে সেই এক৷ নীল সাদা লাল৷ কিংবা ঘুরিয়ে লাল সাদা নীল৷সেই পতাকা বানানোর পিছনেও এক অসাধারণ কাহিনি৷
জর্জ ওয়াশিংটনের অনুগামী সেনারা তাদের জামা কেটে দিয়েছিলেন সাদা পটির অংশ৷ মুক্তিযোদ্ধাদের স্ত্রীরা তাদের ফ্লানেলের পেটিকোট দান করেছিলেন লাল পটির জন্য৷ আর নীলের উপরে সাদা তারকাখচিত অংশটি এসেছিল ক্যাপ্টেন আব্রাহাম স্টাওয়ার্টউটের কোট থেকে৷
তার জন্য জর্জ ওয়াশিংটনের নেতৃত্বাধীন কংগ্রেস ক্যাপটেন স্টাওয়ার্টউটকে মূল্যও চুকিয়েছিল৷ ওই বছরের ১৪ জুন এই পতাকা কংগ্রেসে গৃহীত হয়৷ তার পর ৩ আগস্ট স্ট্যানউইক্স দুর্গ অবরোধের যুদ্ধে প্রথম ওড়ে সেই নক্ষত্রখচিত বিজয়কেতন৷
আমেরিকার স্বাধীনতা যুদ্ধ নিজের চোখে দেখেছিলেন ফরাসি বিপ্লবী লাফায়েত৷ শুধু দেখা নয়, জর্জ ওয়াশিংটন-টমাস জেফারসন-বেঞ্জামিন ফ্র্যাঙ্কলিনের আদর্শে অনুপ্রাণিত লাফায়েত সেই স্বাধীনতার যুদ্ধেও অংশ নিয়েছিলেন৷ তার পর মুক্তির সেই আগুন বুকে নিয়ে ফিরে গিয়েছিলেন ফ্রান্সে৷
লিবার্টি, ইক্যুয়ালিটি, ফ্রেটারনিটি৷একজন মানুষের কাছে আর একজন মানুষের একটাই পরিচয়, সিটিজেন৷ সেতয়্যাঁ৷ ছেঁড়া ছাতা-রাজছত্র মিলে চলে গেছে একই বৈকুণ্ঠের দিকে৷অতঃপর? অতঃপর, বাস্তিল বিজয়৷তার পর ফ্রান্স আর ফিরে দেখে নাই..
সেই আলোতেই আলোকিত নীল সাদা লাল৷ শুধু ফ্রান্স নয়৷ তার আহ্বান ছড়িয়ে পড়ল দিকে দিকে৷ মুক্তি মানেই ফরাসি বিপ্লব৷ কবি শামসুর রাহমানের ভাষায় ‘সকল প্রকার কারাগার থেকে মুক্তি’৷ যে আগুন লাফায়েত বুকে নিয়ে এসেছিলেন তাতে পুড়ছে শত শত বছরের জঞ্জাল, কুসংস্কার, বিকার আর মোহ৷ মিরাবো, সিয়েস, দাঁতঁ, ক্যামিই দেমুল্যাঁ, রোবসপিয়ের’৷
ফ্রান্সের হাত ধরে নতুন বিশ্ব জেগে উঠছে, প্রাণ পাচ্ছে৷ দাঁতঁ তাঁর উদাত্ত কণ্ঠে বলছেন, বিপ্লবের জন্য তিনটি জিনিসের দরকার৷ সাহস, সাহস, আর সাহস৷আটলান্টিকের এক পাড়ের মুক্তি ঝাঁকুনি দিয়ে জাগিয়ে তুলেছে আর এক তটকে৷
আমেরিকা পেরিয়ে ফরাসি বিপ্লবের সেই নীল সাদা লাল কি কেবল ইউরোপকেই জাগিয়ে তুলেছিল? ডিরোজিও-র শিক্ষায় অনুপ্রাণিত-উদ্বুদ্ধ ছাত্র-যুবরা তাহলে কেন এই কলকাতা শহরে অক্টারলোনি মনুমেন্টের (এখনকার শহীদ মিনার) তুলল ফরাসি বিপ্লবের পতাকা? স্তম্ভিত হয়ে গিয়েছিল ব্রিটিশ রাজ৷
সেই অষ্টাদশ শতকের শেষবেলায় ওড়া নীল সাদা লালকে এখনও ভয় পায় অন্ধকার৷ সূর্যের আলো-অগ্নিকুণ্ড যেমন তমসা ঘুচিয়ে দেয়, নীল সাদা লালেরও তো সেই একই শক্তি, একই ক্ষমতা৷ এই তমসা কখনও দেখা দিয়েছে রাজতান্ত্রিক আড়ম্বর-আভিজাত্যের আংরাখার ছায়ায়, কখনও ধর্মবেশধারী মোহান্ধের নির্বিচার তাণ্ডবে৷
১৪ নভেম্বরেও সেই একই তমসা হিংসার চেহারা নিয়ে হেনেছে নিঃসহায়ে৷ এবারও তার টার্গেট ঘুরেফিরে সেই নীল সাদা লাল৷ লিবার্তে ইগালিতে ফ্রেতারনিতে৷
মানবসভ্যতাকে টিঁকে থাকতে হলে এই অন্ধকারের শক্তির সঙ্গে পাঞ্জা কষেই বাঁচতে হবে৷বাঁচতে হবে নীল সাদা লালের ভরসায়৷যার উলটো পিঠে রয়েছে ডুমস অব ডেমোক্লেস কিংবা মঁসিয়ে গিলোটিন৷
নিখিলেশ রায়চৌধুরী বিশিষ্ট সাংবাদিক
কলকাতা24x7
রানা একেবারেই ভুল বলেনি৷ সত্যিই নীল সাদা লালেই যত আক্রোশ সন্ত্রাসবাদীদের৷তার কারণ, এই রঙের ছটাতেই তো পৃথিবীতে ছড়িয়ে পড়েছিল মানবসভ্যতার প্রথম মুক্তির বাণী: লিবার্তে, ইগালিতে, ফ্রেতারনিতে (মুক্তি, সাম্য, ভ্রাতৃত্ব)৷
এই নীল সাদা লাল-ই তো প্রথম উড়েছিল আমেরিকার মাটিতে৷ জর্জ ওয়াশিংটনের নেতৃত্বে৷ ব্রিটিশ উপনিবেশবাদীদের ঝেঁটিয়ে বিষ ঝেড়ে দিয়েছিলেন জর্জ ওয়াশিংটন আর তার সঙ্গীরা৷
১৭৭৭ সালে সেখানকার ১৩টি ব্রিটিশ কলোনি প্রথম স্বাধীনতা ঘোষণা করে যে জাতীয় পতাকার জন্ম দিয়েছিল তারও রং আদতে সেই এক৷ নীল সাদা লাল৷ কিংবা ঘুরিয়ে লাল সাদা নীল৷সেই পতাকা বানানোর পিছনেও এক অসাধারণ কাহিনি৷
জর্জ ওয়াশিংটনের অনুগামী সেনারা তাদের জামা কেটে দিয়েছিলেন সাদা পটির অংশ৷ মুক্তিযোদ্ধাদের স্ত্রীরা তাদের ফ্লানেলের পেটিকোট দান করেছিলেন লাল পটির জন্য৷ আর নীলের উপরে সাদা তারকাখচিত অংশটি এসেছিল ক্যাপ্টেন আব্রাহাম স্টাওয়ার্টউটের কোট থেকে৷
তার জন্য জর্জ ওয়াশিংটনের নেতৃত্বাধীন কংগ্রেস ক্যাপটেন স্টাওয়ার্টউটকে মূল্যও চুকিয়েছিল৷ ওই বছরের ১৪ জুন এই পতাকা কংগ্রেসে গৃহীত হয়৷ তার পর ৩ আগস্ট স্ট্যানউইক্স দুর্গ অবরোধের যুদ্ধে প্রথম ওড়ে সেই নক্ষত্রখচিত বিজয়কেতন৷
আমেরিকার স্বাধীনতা যুদ্ধ নিজের চোখে দেখেছিলেন ফরাসি বিপ্লবী লাফায়েত৷ শুধু দেখা নয়, জর্জ ওয়াশিংটন-টমাস জেফারসন-বেঞ্জামিন ফ্র্যাঙ্কলিনের আদর্শে অনুপ্রাণিত লাফায়েত সেই স্বাধীনতার যুদ্ধেও অংশ নিয়েছিলেন৷ তার পর মুক্তির সেই আগুন বুকে নিয়ে ফিরে গিয়েছিলেন ফ্রান্সে৷
লিবার্টি, ইক্যুয়ালিটি, ফ্রেটারনিটি৷একজন মানুষের কাছে আর একজন মানুষের একটাই পরিচয়, সিটিজেন৷ সেতয়্যাঁ৷ ছেঁড়া ছাতা-রাজছত্র মিলে চলে গেছে একই বৈকুণ্ঠের দিকে৷অতঃপর? অতঃপর, বাস্তিল বিজয়৷তার পর ফ্রান্স আর ফিরে দেখে নাই..
সেই আলোতেই আলোকিত নীল সাদা লাল৷ শুধু ফ্রান্স নয়৷ তার আহ্বান ছড়িয়ে পড়ল দিকে দিকে৷ মুক্তি মানেই ফরাসি বিপ্লব৷ কবি শামসুর রাহমানের ভাষায় ‘সকল প্রকার কারাগার থেকে মুক্তি’৷ যে আগুন লাফায়েত বুকে নিয়ে এসেছিলেন তাতে পুড়ছে শত শত বছরের জঞ্জাল, কুসংস্কার, বিকার আর মোহ৷ মিরাবো, সিয়েস, দাঁতঁ, ক্যামিই দেমুল্যাঁ, রোবসপিয়ের’৷
ফ্রান্সের হাত ধরে নতুন বিশ্ব জেগে উঠছে, প্রাণ পাচ্ছে৷ দাঁতঁ তাঁর উদাত্ত কণ্ঠে বলছেন, বিপ্লবের জন্য তিনটি জিনিসের দরকার৷ সাহস, সাহস, আর সাহস৷আটলান্টিকের এক পাড়ের মুক্তি ঝাঁকুনি দিয়ে জাগিয়ে তুলেছে আর এক তটকে৷
আমেরিকা পেরিয়ে ফরাসি বিপ্লবের সেই নীল সাদা লাল কি কেবল ইউরোপকেই জাগিয়ে তুলেছিল? ডিরোজিও-র শিক্ষায় অনুপ্রাণিত-উদ্বুদ্ধ ছাত্র-যুবরা তাহলে কেন এই কলকাতা শহরে অক্টারলোনি মনুমেন্টের (এখনকার শহীদ মিনার) তুলল ফরাসি বিপ্লবের পতাকা? স্তম্ভিত হয়ে গিয়েছিল ব্রিটিশ রাজ৷
সেই অষ্টাদশ শতকের শেষবেলায় ওড়া নীল সাদা লালকে এখনও ভয় পায় অন্ধকার৷ সূর্যের আলো-অগ্নিকুণ্ড যেমন তমসা ঘুচিয়ে দেয়, নীল সাদা লালেরও তো সেই একই শক্তি, একই ক্ষমতা৷ এই তমসা কখনও দেখা দিয়েছে রাজতান্ত্রিক আড়ম্বর-আভিজাত্যের আংরাখার ছায়ায়, কখনও ধর্মবেশধারী মোহান্ধের নির্বিচার তাণ্ডবে৷
১৪ নভেম্বরেও সেই একই তমসা হিংসার চেহারা নিয়ে হেনেছে নিঃসহায়ে৷ এবারও তার টার্গেট ঘুরেফিরে সেই নীল সাদা লাল৷ লিবার্তে ইগালিতে ফ্রেতারনিতে৷
মানবসভ্যতাকে টিঁকে থাকতে হলে এই অন্ধকারের শক্তির সঙ্গে পাঞ্জা কষেই বাঁচতে হবে৷বাঁচতে হবে নীল সাদা লালের ভরসায়৷যার উলটো পিঠে রয়েছে ডুমস অব ডেমোক্লেস কিংবা মঁসিয়ে গিলোটিন৷
নিখিলেশ রায়চৌধুরী বিশিষ্ট সাংবাদিক
কলকাতা24x7

0 comments:
একটি মন্তব্য পোস্ট করুন