নৈসর্গিক সৌন্দর্যের বিস্ময় শুসং দুর্গাপুর

শুসং দুর্গাপুর, স্বচ্ছ পানি আর চিনামাটির অপরূপ মেলবন্ধনের এক নাম। প্রাকৃতিক বৈচিত্র্যময় গারো পাহাড়ের মনোরম দৃশ্য যে কারও নজর কাড়ে। দুর্গাপুরের বুক বেয়ে চলা সোমেশ্বরী নদীর ছন্দময় চলনও বেশ আকর্ষণীয়। ঋতুচক্রের পালাক্রমে নদী তার রূপ বদলায়।
সূর্যের আলোয় চিকচিক করে স্বচ্ছ পানি আর সাদা বালি। এ যেন প্রকৃতির এক অনন্য সৃষ্টি। তটিনীর আঁকাবাঁকা জলধারারের ওপর দিয়ে বয়ে চলেছে কত নৌকা, স্টিমার ও লঞ্চ।

ভ্রমণপিয়াসীদের কাছে শুসং দুর্গাপুরের আকর্ষণীয় স্থানগুলোর মধ্যে রানীখং, বিজয়পুর ক্যাম্প, চিনামাটির পাহাড় অন্যতম। নদীপথে যেতে প্রথমেই আপনাকে দুর্গাপুর শহর থেকে সোমেশ্বরী নদীঘাটে পৌঁছতে হবে। ঘাট থেকে মাত্র পাঁচ কিলোমিটার দূরেই বিজয়পুর। যাতায়াতের জন্য রয়েছে ইঞ্জিনচালিত নৌকা; ট্রলারেও যেতে পারেন। ঘণ্টা দুয়েকের মধ্যেই পৌঁছা যায় বিজয়পুর ক্যাম্পে। ক্যাম্প থেকে রানীখং। সেখান থেকে চার কিলোমিটার পেরিয়ে চিনামাটির পাহাড়।

ক্যাম্পের কিছুদূরেই কমলাবাগানের পাহাড়। তার ওপর সুউচ্চ পর্যবেক্ষণ টাওয়ার। টাওয়ার থেকে পুরো এলাকা একনজরে অবলোকন করা যায়। পাশের ঢালো পথে কিছুটা এগুলেই চোখে পড়ে পাতাল থেকে পানি ওঠার দৃশ্য। চতুর্দিকে বিস্তৃণ সবুজ প্রান্তর আর গজারী বনের সমারোহ। দুর্গাপুরের পাশেই ভারতের সীমান্তবর্তী মেঘালয় রাজ্য। প্রাচীনকালে এই মেঘালয় রাজ্যটি ছিল আসামের অন্তর্ভুক্ত। বিজয়পুর ক্যাম্প থেকে আধাপাকা রাস্তায় কিছুপথ অতিক্রম করলেই রানীখং। সমতল ভূমি থেকে খাড়া ও ঢালো স্থানে এর অবস্থান। ফটকের ভিতরে প্রবেশ করলেই চোখে পড়ে রানীখং-এর সৌন্দর্য। সিঁড়ি দিয়ে কয়েক ধাপ এগুলেই যীশু খ্রিস্টের ভাস্কর্য, একাডেমি ও প্রার্থনাকক্ষ। সামনে ফুলের বাগান। বাগানের সম্মুখে শুসং রাজার প্রাসাদ, রামকৃষ্ণ, বাবা লোকনাথ ও দাশবুশার মন্দির। রানীখং থেকে চার কিলোমিটার দূরে দুর্গাপুরের অন্যতম আকর্ষণীয় স্থান সাদামাটির পাহাড়। পড়ন্ত বিকালে নীল আকাশ আর চিনামাটির পাহাড় মিলেমিশে একাকার হয়ে এক মনোমুগ্ধকর আবেশ সৃষ্টি করে।

নৈসর্গিক সৌন্দর্যের এক বিস্ময় শুসং দুর্গাপুর। পাহাড়, নদী ও মাটির সঙ্গে মিতালী করে বিভিন্ন জাতিসত্তার মানুষের বসবাস সেখানে। কালক্রমে মুসলমানদের সঙ্গে গারো, হাজং, আচিক ও মানদি উপজাতিদের গড়ে উঠেছে ঐক্যের বাঁধন। গারো পাহাড়ে চোখে পড়ে উপজাতিদের আনাগোনা, কাজ-কর্ম, ব্যবস্থা-বাণিজ্য, আড্ডা আরও কত কি। বেড়াতে পারেন দুর্গাপুরের বিরিশিরি সাংস্কৃতিক একাডেমিতেও।

শুসং দুর্গাপুর হতে পারে বাংলাদেশের অন্যতম আকর্ষণীয় পর্যটন কেন্দ্র। তার জন্য পুরো এলাকার দর্শনীয় স্থানগুলোর সংস্কার, আধুনিকায়ন, কিছু কৃত্রিম স্থাপনা তৈরি, যোগাযোগ ব্যবস্থার উন্নয়ন এবং প্রয়োজনীয় অবকাঠামো সৃষ্টির উদ্যোগ গ্রহণ করতে হবে। তাতে একদিকে যেমন চিত্তবিনোদনের সুযোগ বৃদ্ধি পাবে, অন্যদিকে সরকারও এ থেকে অর্থনৈতিকভাবে লাভবান হবে; ফুটে উঠবে দেশের শ্রী।



যেভাবে যাবেন

শুসং দুর্গাপুর ঢাকা থেকে ১৭০ কিলোমিটার উত্তরে নেত্রকোনা জেলায় অবস্থিত। ঢাকা থেকে দুর্গাপুর যাওয়ার সরাসরি বাস চলাচল করে। পৌঁছতে সময় লাগে ৫ থেকে ৬ ঘণ্টা। এ ছাড়াও ময়মনসিংহ থেকে দুর্গাপুর যাওয়া যায় মাত্র ২ ঘণ্টায়। দুর্গাপুর থেকে বাইপাস কিংবা নদীপথেও যাওয়া যায় বিজয়পুর। সোমেশ্বরী নদীর ঘাট থেকে পাঁচ কিলোমিটার দূরে বিজয়পুর। রানীখং, বিজয়পুর ক্যাম্প ও সাদামাটির পাহাড়- কোনো স্থানেই থাকা-খাওয়ার বিশেষ ব্যবস্থা নেই। তাই সঙ্গে শুকনা খাবার ও প্রয়োজনীয় জিনিসপত্র নিয়ে যাওয়াই উত্তম।
Share on Google Plus

About MONOJ SARKER

This is a short description in the author block about the author. You edit it by entering text in the "Biographical Info" field in the user admin panel.

0 comments:

একটি মন্তব্য পোস্ট করুন