ঘুরে এলাম জুরাছড়ি

ধ্বংস নয় রক্ষা .. কংত্রিট নয় প্রকৃতি ... আসুন আমরা আমাদের নিজেদের স্বার্থেই প্রকৃতি রক্ষা করি। এ স্লোগান ধারণ করেই ট্রলারে চেপে ছুটে গিয়েছিলাম রাঙ্গামাটি জেলার গহিনের সৌন্দর্য জুরাছড়ি।
সাধারণত পর্যটকরা ওইদিকে তেমন একটা যান না। জুরাছড়ি রাঙ্গামাটি জেলার অত্যন্ত দুর্গম এক উপজেলা। অধিকাংশ ভ্রমণপিপাসুদের কাছে এর অপার সৌন্দর্য অজানা। এছাড়া থৈ থৈ পানিতে নৌ ভ্রমণের মজাই আলাদা।
রাতে গাড়িতে চড়ে ভোর বেলা পৌঁছায়। ফোন পেয়ে গাইড হারুন আর ট্রলার মালিক হাজির। দলে আমরা ১৪ জন। রিজার্ভ বাজার থেকে নাশতা পর্ব শেষেই উঠে পড়ি ট্রলারে। আগামী তিন দিন এ ট্রলারই হবে আমাদের বাড়ি। বাজার-সদাই সবই আগে থেকে করে রাখি। ট্রলার ছাড়ে কাপ্তাইয়ের নীলাভ পানির বুকে। ভ্রমণপিপাসু দে-ছুট দলে সুযোগ পাওয়া নতুনদের উচ্ছ্বাস ছিল যেন একটু বেশিই। সবুজে মোড়ানো পাহাড় আর কাপ্তাই লেকের নীল পানি সঙ্গী করেই ট্রলার এগিয়ে যায় প্রাকৃতিক স্বর্গ পানে। যতই এগিয়ে যাই ততই সামনের পাহাড় যেন দূরে সরে যায়। সেল্ফি পাগল আরাফাতের বদৌলতে দূরের সবুজ বনায়নকে মনে হয় হাতের মুঠোয়!
কখনও কখনও চার পাশের মায়াময় প্রকৃতির ঘোরে আছন্ন হয়ে পড়ি, টনক ফিরে যখন ইউশা অতি উচ্ছ্বাসে চলতি ট্রলার থেকেই ঝাঁপিয়ে পড়ে পানিতে। তাই না দেখে কেউ কেউ হেসে ওঠে। জুরাছড়ি যাওয়ার পথে নৈসর্গিক দৃশ্যের মাঝে ছোট ছোট দ্বীপে মানুষের বসত দেখে মুগ্ধ হই। দুপুর গড়িয়ে প্রায় বিকাল। ফারুকের পরিবেশনায় চলছে অনবরত খাবারের ধুম আর কালামের ১৩ মিশালি আইটেম মেশানো লিকার চায়ে চুমুক। বাড়তি আনন্দ পেতে মাঝে মধ্যেই মোস্তাকের হেড়ে গলায় গান আর আমার নাদুস-নুদুস দেহের আদিকালের নৃত্য। পড়ন্ত বিকালে যেন সবাই হারিয়ে যাই সৌন্দর্যের মাঝে। মাঝিও ঠিক পথ চিনে উঠতে পারছিলেন না।
বর্ষায় পাহাড়ের সৌন্দর্যই যেন অন্যরকম আর শরৎ। এ প্রকৃতি নিজেকে মেলে ধরে ভিন্ন আমেজে। জুরাছড়ি যাওয়ার পুরোটা পথ এমন সৌন্দর্যের অবগাহন যে, যতদূর চোখ যায় শুধু সবুজের মাখামাখি। কখনও কখনও মনে হয়েছিল
নীল আসমানটা যেন নেমে আসছে দে-ছুটের দামালদের সঙ্গে দুস্তি পাতাতে। শেষ বিকালে গিয়ে পৌঁছি বড়তলী ঘাটে। জাল পাতার কারণে ট্রলার আর সামনে এগোবে না অগত্যা নেমে পড়ি। আগে থেকেই ডিএসবির দুজন অফিসার এসে হাজির।
তাদের সঙ্গে পরিচয় পর্ব শেষে ভাড়া খাটা বাইকে ছুটি থানা ভবনে। পথের দুপাশে পাহাড়ের সারি মাঝে আঁকা-বাঁকা পিচঢালা পথ কখনও মনে হবে বাইক এই বুঝি পথ ভুল করে হারিয়ে যাচ্ছে ঘন জঙ্গলের মাঝে। সে এক অসাধারণ ভালো লাগা, লিখে বোঝাবে এমন কোনো লেখকের সাধ্য নেই। দুই চোখে দেখার সুযোগ না হলে শুধু অনুভবে কারও বোঝার সাধ্য নেই জুরাছড়ির নয়নাভিরাম সৌন্দর্য।
যোগাযোগ : ঢাকা কমালাপুর ও গাবতলী থেকে রাতে বিভিন্ন পরিবহনের বাস ছেড়ে যায় রাঙ্গামাটি।
ভাড়া নন এসি ৬২০ টাকা। ট্রলার তিন দিনের জন্য নেবে ১০ থেকে ১১ হাজার টাকা। লঞ্চযোগেও যেতে পারেন রিজার্ভ বাজার থেকে। সকাল ৭টা ৩০ মিনিট থেকে দুপুর ১টা পর্যন্ত। ভাড়া জনপ্রতি ১৬০ থেকে ২০০ টাকা।
কোথায় থাকবেন : রাতে ট্রলারেই থাকতে হবে এমন প্রস্তুতি নিয়েই উঠতে হবে।
খাবেন কোথায় : বাজার-সদাই করে নিতে হবে। রান্নার আয়োজন ট্রলারেই সারতে হবে।
খরচপাতি : দল বড় হলে মাথা পিছু ৫ থেকে ৬ হাজার টাকা হলেই হবে। তবে খরচ নির্ভর করবে নিজেদের ওপর। আর কি কি দেখবেন : বরকল বিজিবি ক্যাম্প থেকে অনুমতি নিয়ে ভূষণ ছড়া ও ছোট হরিণা যেতে পারেন এবং ফেরার দিন মিটিঙ্গাছড়ি, সুবলং ঝরনা, ঝুলন্ত ব্রিজ ও ডিসিহিল পার্কে ঘুরতে পারেন।
টিপ্স
* লাইফ জ্যাকেট সঙ্গে নেবেন
* সম্ভব হলে প্রশাসনের ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তাদের জানিয়ে যাবেন
* দল বড় করার চেয়ে ছোট দলে দুর্গম পথে অধিক আনন্দ।
কৃতজ্ঞতা : রাঙ্গামাটি জেলার অতিরিক্ত পুলিশ সুপার ও স্থানীয় সাংবাদিক মি. শংকর অরোরা এবং ঢাকা গাবতলীর সমাজসেবক আপফু খান।
সূত্র: দৈনিক যুগান্তর
Share on Google Plus

About MONOJ SARKER

This is a short description in the author block about the author. You edit it by entering text in the "Biographical Info" field in the user admin panel.

0 comments:

একটি মন্তব্য পোস্ট করুন