দেশী-বিদেশী বাধার মুখে রফতানি খাত

দেশী-বিদেশী নানা বাধার মুখে পড়েছে বাংলাদেশের রফতানি খাত। নতুন বাজার সৃষ্টি ও পণ্যের পরিমাণ বাড়ানোর ব্যাপক উদ্যোগ সত্ত্বেও এ কারণে রফতানি খাতে কাঙ্ক্ষিত ফল আসছে না।
দায়িত্বশীল সূত্রগুলোর দাবি, অঞ্চলভিত্তিক রাজনৈতিক, কূটনৈতিক ও বাণিজ্যিক সম্পর্কের ও টানাপোড়েন এবং বিশ্ব পরিস্থিতি দিন দিন অস্থিতিশীল হয়ে ওঠায় এমনটা হচ্ছে।
এছাড়া রফতানি বাণিজ্যে সাম্প্রতিক সময়ে আরেক আতংক অ্যান্টি ডাম্পিং বাংলাদেশের সামনে হাজির হয়েছে। পাট ও পাটজাত পণ্য রফতানির ক্ষেত্রে ইরান, মিসর ও ব্রাজিলের মতো বড় বাজারে অ্যান্টি ডাম্পিংয়ের ফাঁদে পড়তে হয় বাংলাদেশকে।
নতুন করে আরেক শীর্ষ আমদানিকারক দেশ ভারতের বাজারেও বাংলাদেশের পণ্য অ্যান্টি ডাম্পিংয়ের ফাঁদে পড়ার উপক্রম হয়েছে। বাধা আসতে পারে পাকিস্তানের বাজারে হাইড্রোজেন পার অক্সাইড রফতানির ক্ষেত্রেও। এসবের নেতিবাচক প্রভাব পড়ছে সার্বিক রফতানি খাতে।
রফতানি উন্নয়ন ব্যুরোর (ইপিবি) মাসওয়ারী রফতানি আয়ের সর্বশেষ জরিপে এমন দৈন্যই ফুটে উঠেছে। ইপিবির পরিসংখ্যান পর্যালোচনায় দেখা যায়, চলতি ২০১৫-১৬ অর্থবছরের প্রথম চার মাসে (জুলাই-অক্টোবর) লক্ষ্যমাত্রার তুলনায় রফতানি আয় কমেছে পৌনে ৪ শতাংশ। এর আগে প্রথম প্রান্তিকে (জুলাই-সেপ্টেম্বর) রফতানি আয় লক্ষ্যমাত্রার চেয়ে কমেছিল সোয়া ৪ শতাংশ। সর্বশেষ একক মাস হিসেবে অক্টোবরেও ৪ কোটি ৭৫ লাখ ডলারের রফতানি আয় কম হয়েছে। এটি ধার্যকৃত লক্ষ্যমাত্রার তুলনায় শতকরা প্রায় ২ শতাংশ কম।
আর রফতানির শীর্ষ খাত ওভেন গার্মেন্ট রফতানি লক্ষ্যমাত্রা থেকে দূরে আছে ৮ দশমিক ১৯ শতাংশ। অপরদিকে লক্ষ্যমাত্রা থেকে নিটওয়্যারে অর্জন মাত্র ০.৮ শতাংশ বেশি। যদিও এ দুটি খাতেই গত বছরের একই সময়ের তুলনায় প্রবৃদ্ধি ভালো হয়েছে।
এ ব্যাপারে বাণিজ্য মন্ত্রণালয়ের সিনিয়র সচিব হেদায়েতুল্লাহ আল মামুন বলেন, ধার্যকৃত লক্ষ্যমাত্রার সঙ্গে নয়, রফতানি আয়কে প্রবৃদ্ধির সঙ্গে বিবেচনা করতে হবে। সেটি বিবেচনা করলে বিশ্ব পরিস্থিতির অস্থিতিশীলতার পাশাপাশি অভ্যন্তরীণ নানা প্রতিকূলতায়ও কিন্তু আমাদের রফতানি কমেনি। বরং বেড়েছে।
তিনি বলেন, রফতানি প্রবৃদ্ধিকে গত অর্থবছরের (২০১৪-১৫) হিসাবে চলতি অর্থবছরের একই সময়ে প্রায় ৫ শতাংশ বেশি প্রবৃদ্ধি অর্জিত হয়েছে। এছাড়া একক মাস হিসেবে অক্টোবরে এই প্রবৃদ্ধি ২১ শতাংশের বেশি বলে দাবি করেন তিনি।
এদিকে দায়িত্বশীল রফতানিকারক সূত্রগুলোর দাবি শুধু চলতি সময়ে নয়, রফতানি আয় কমছিল গত অর্থবছরের গোড়ার দিক থেকেই। ওই মন্দা পরিস্থিতি এখনও কাটিয়ে উঠতে পারেনি বাংলাদেশ। বিশ্ববাজারে বাংলাদেশের রফতানির ১৩ অঞ্চলেই কমবেশি বাধা-বিপত্তি মোকাবেলা করে আসছে।
যুক্তরাষ্ট্রের বাজারে জিএসপি সুবিধা না পাওয়াকে কেন্দ্র করে আমদানিকারক দেশগুলোর কাছে বাংলাদেশের পণ্যের কমপ্লায়েন্স মান নিয়ে প্রশ্ন উঠছে। ঘনঘন অভ্যন্তরীণ অস্থিতিশীলতার নেতিবাচক সংবাদও বিশ্বে দ্রুত চাউর হচ্ছে। এ সুযোগ নিচ্ছে প্রতিযোগী অন্য দেশগুলো। সর্ববৃহৎ রফতানি অঞ্চল ইউরোপীয় ইউনিয়নের দেশগুলোতেও দীর্ঘদিন ধরে মন্দা যাচ্ছে। এই মন্দা পরিস্থিতি এখনও বহাল আছে। সেই সঙ্গে কমছে ইউরো মুদ্রার মান। ডলার ও রুবলের দামও কমছে। এর বিপরীতে বাংলাদেশী টাকার মান বাড়ছে। ফলে এক ইউনিট পণ্য রফতানি করে আগে যে পরিমাণ বৈদেশিক মুদ্রা পাওয়া যেত, এখন তার চেয়ে কম পাওয়া যাচ্ছে।
এ প্রসঙ্গে জানতে চাইলে দেশের তৈরি পোশাক শিল্প মালিকদের সংগঠনের (বিজিএমইএ) সভাপতি মো. সিদ্দিকুর রহমান জানান, রফতানি খাতে নানা বাধা-বিপত্তি আছে। এরপরও এগিয়ে যাচ্ছি আমরা। কিন্তু অভ্যন্তরীণ ও বৈশ্বিক পরিস্থিতির বিদ্যমান ধারা বহাল থাকলে বিশ্ববাজারে আমাদের কঠিন প্রতিযোগিতার সম্মুখীন হতে হবে।
তিনি বলেন, রফতানি বাজার ইউরো জোনে দীর্ঘ অস্থিরতা, ইউরো, ডলার ও রুবলের দরপতন এবং ডলারের বিপরীতে টাকার শক্তিশালী অবস্থানের কারণে প্রত্যাশিত হারে বৈদেশিক মুদ্রা দেশে আসছে না। এর সঙ্গে নানা ছুতায় কমানো হচ্ছে বাংলাদেশের পণ্যের দামও।
সম্ভাব্য এই কঠিন পরিস্থিতি থেকে উত্তরণের জন্য আমদানি-রফতানি বাণিজ্যে পৃথক মুদ্রা বিনিময় হার নির্ধারণ করার ওপর গুরুত্বরোপ করেন তিনি। এজন্য বিজিএমইএ দেশের সব স্টেকহোল্ডারকে নিয়ে শিগগির বৈঠকে বসবে বলে তিনি জানান।
রফতানি আয়ের চিত্র পর্যালোচনায় দেখা যায়, ২০১৫-১৬ অর্থবছরে রফতানি লক্ষ্যমাত্রা ধার্য রয়েছে তিন হাজার ৩৫০ কোটি টাকা। এর মধ্যে জুলাই-অক্টোবর এই চার মাসের লক্ষ্যমাত্রা ধার্য করা হয় এক হাজার ৫২ কোটি ৩০ লাখ ডলার। তবে নির্ধারিত সময়সীমা শেষে এই চার মাসে রফতানি আয় হয় প্রায় ৭৭৬ কোটি ডলার। ফলে লক্ষ্যমাত্রা থেকে ৪ দশমিক ২৫ শতাংশ আয় অর্জন থেকে দূরে আছে রফতানি খাত।
এ প্রসঙ্গে পলিসি রিসার্চ ইন্সটিটিউটের নির্বাহী পরিচালক ড. আহসান এইচ মনসুর যুগান্তরকে বলেন, রফতানি পরিস্থিতি এখনও ক্ষয়িষ্ণুর দিকে ধাবিত হয়নি। তবে অভ্যন্তরীণ ও বিশ্ব পরিস্থিতির দ্রুত উন্নতি না হলে পরিস্থিতি খারাপের দিকে যাবে। কীভাবে মন্দা পরিস্থিতি মোকাবেলা করে রফতানির গতিশীলতা অব্যাহত রাখা যায় যৌথভাবে সরকার ও উদ্যোক্তাদের সে উপায় বের করতে হবে।
তিনি বলেন, রফতানি বাড়াতে হলে সরকারকে আরও কার্যকর নীতি ও সহায়তামূলক পদক্ষেপ নিতে হবে। বিশ্বের ১৭০টি দেশে এখন বাংলাদেশের পণ্য রফতানি হচ্ছে এটি যেমন সত্য, তেমনি এই কৃতিত্ব ও আত্মতৃপ্তি নিয়ে সরকার কিংবা রফতানিকারক কাউকেই বসে থাকলে চলবে না।
বরং যৌথ প্রচেষ্টা ও সম্মিলিত উদ্যোগের মাধ্যমে ওইসব দেশে আরও বেশি পণ্য রফতানির উদ্যোগ নিতে হবে। ওইসব দেশ থেকে যতটা সম্ভব শুল্কমুক্ত ও কোটামুক্ত সুবিধা আদায় করতে হবে।
একইভাবে উদ্যোক্তাদের দর কষাকষির সক্ষমতা বাড়াতে হবে। এর জন্য অবশ্যই রফতানি পণ্যের বহুমুখীকরণ ও গুণগতমানের প্রতিও যত্নবান হতে হবে।
বাংলাদেশ রফতানিকারক সমিতির (ইএবি) সভাপতি আবদুস সালাম মুর্শেদী বলেন, একদিকে বাড়ছে উৎপাদন ব্যয়। বাড়ছে পরিবহন ব্যয় ও শ্রমের মজুরি। কিন্তু সেই অনুযায়ী বাড়েনি পণ্যের আন্তর্জাতিক বাজার দাম। উল্টো দাম কমানো হচ্ছে।
রানা প্লাজা, তাজরীন, স্পেকট্রাম দুর্ঘটনার কলংক মোচন শেষ না হতেই নতুন করে বাংলাদেশকে আরেক দফা ইমেজ সংকটের মুখে ঠেলে দিয়েছে বিদেশী নাগরিক হত্যাকাণ্ড।
সামনে টিপিপি ইস্যুও আমাদের জন্য আতংকের কারণ। এর ফলে আমাদের বৈশ্বিক ভাবমূর্তি, বাংলাদেশমুখী ক্রেতা ধরে রাখা এবং একই সঙ্গে পণ্যমূল্য বাড়ানো খুবই চ্যালেঞ্জপূর্ণ হয়ে উঠছে। সূত্র: দৈনিক যুগান্তর
Share on Google Plus

About MONOJ SARKER

This is a short description in the author block about the author. You edit it by entering text in the "Biographical Info" field in the user admin panel.

0 comments:

একটি মন্তব্য পোস্ট করুন